প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিরোধী রাজনৈতিক প্রচারণা নতুন করে উসকে উঠেছে টেক্সাসের রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে। নিউ ইয়র্কে জোহরান মামদানি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনৈতিক অঙ্গনে ইসলামবিদ্বেষ আরও তীব্র হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় টেক্সাসে কথিত ‘শরিয়াহ আদালত’ নিয়ে অ্যাবট যে তদন্তের ডাক দিয়েছেন, তা বাস্তবতার চেয়ে রাজনীতিকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। মূলত মুসলিম আমেরিকানদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার একটি অংশ হিসেবে দেখছেন মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকেরা।
১৯ নভেম্বর গভর্নর অ্যাবট হঠাৎই অভিযোগ তোলেন যে টেক্সাসের মুসলমানরা নাকি প্রচলিত আইনের বাইরে ‘গোপনে বিকল্প আইনি কাঠামো’ গড়ে তুলছেন। তিনি জেলা অ্যাটর্নি ও স্থানীয় শেরিফদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তদন্তের আহ্বান জানান। কিন্তু তাঁর এই অভিযোগের ভিত্তি বলতে কোনো প্রমাণ, অভিযোগ বা বাস্তব অনিয়ম কিছুই ছিল না। বরং টেক্সাসে কোনো ‘শরিয়াহ আদালত’ই নেই—যা আছে তা হলো স্বেচ্ছাসেবী মুসলিম মধ্যস্থতা প্যানেল, যা ইহুদি বেথদিন বা খ্রিস্টান মধ্যস্থতা পরিষেবার মতোই সীমিত পরিসরে ধর্মীয় বা পারিবারিক বিষয়ে নৈতিক পরামর্শ দিয়ে থাকে।
তবু গভর্নর অ্যাবটের চিঠি যেন আতঙ্ক সৃষ্টিরই একটি প্রচেষ্টা। মুসলমানদের বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অপব্যাখ্যা ব্যবহার করে তিনি দাবি করেন যে ধর্মীয় ভিত্তিক সালিশি পরিষেবাগুলো নাকি সংবিধানের বাইরে গিয়ে ‘রাষ্ট্রীয় আইনের বিকল্প ব্যবস্থা’ তৈরি করছে। আইনজীবীরা ইতোমধ্যেই পরিষ্কার করেছেন, এই অভিযোগ আইনগতভাবে ভিত্তিহীন; এমনকি অ্যাবট যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন, তার অনেকগুলোর অধিকার তাঁর নেইই।
এই বিতর্ক ওঠার একদিন আগে ১৮ নভেম্বর অ্যাবট আরও বড় একটি পদক্ষেপ নেন। তিনি নির্বাহী আদেশ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন—কাউন্সিল অন আমেরিকান–ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার)–কে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করেন। অথচ এমন গুরুতর অভিযোগ আনার ক্ষেত্রে কোনও অপরাধের প্রমাণ, সহিংসতা, ষড়যন্ত্র বা সরকারি তদন্ত—কোনো কিছুই তুলে ধরেননি তিনি। শুধু দাবি করা হয়েছে, সংগঠনটি নাকি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে কোনও সংগঠনকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করার একক কর্তৃত্ব কেবল ফেডারেল সরকারের, কোনও অঙ্গরাজ্যের গভর্নরের নয়। ফলে অ্যাবটের আদেশ শুধু অকার্যকরই নয়, বরং এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর লক্ষ্য মুসলিম আমেরিকানদের সন্দেহভাজন হিসেবে উপস্থাপন করা এবং নাগরিক সমাজে তাদের অংশগ্রহণকে ‘ঝুঁকি’ হিসেবে দেখানোর একটি কৌশল।
টেক্সাসে মুসলিমবিরোধী উত্তেজনা গত কয়েক বছর ধরেই একটি সুপরিকল্পিত প্রচারণার মাধ্যমে উসকে দেওয়া হচ্ছে। ‘শরিয়াহ আতঙ্ক’ তৈরি করে অঙ্গরাজ্যে আইন প্রণেতাদের চাপ দেওয়া হয়েছে বিদেশি আইন নিষিদ্ধ করার নামে ইসলামি আইনকে লক্ষ্যবস্তু করতে। ২০১০ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টিরও বেশি রাজ্যে ‘বিদেশি আইন নিষিদ্ধ’—এরকম বিল উঠেছিল, যার অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল ইসলাম ও মুসলমানদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি। ওকলাহোমায় তো এমনকি সংবিধানে সংশোধনী আনেও ভোটাররা, যাতে শরিয়াহ আইনের প্রয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়—যদিও আগে কখনোই তা প্রয়োগ হয়নি।
টেক্সাসেও একই পথ অনুসরণ করা হয়েছে। কয়েক মাস আগে মুসলিম পরিচালিত একটি রিয়েল এস্টেট প্রকল্পকে ‘শরিয়াহ উপনিবেশ’ বলে গুজব ছড়িয়ে স্থানীয় জনগণকে উত্তেজিত করা হয়। মিথ্যা বলা হয় যে সেখানে ইসলামি আইন চালু হবে, অমুসলিমরা বাদ পড়বে এবং এটি নাকি মুসলিম দখলদারির অংশ। তদন্ত শেষে বিচার বিভাগ এসব অভিযোগের কোনো সত্যতা না পেলেও অনলাইনে প্রচারণা থেমে থাকেনি। বরং সেপ্টেম্বরে অ্যাবট আরেক ধাপ এগিয়ে শরিয়াহ-সম্পৃক্ত যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনা নিষিদ্ধকারী আইনে স্বাক্ষর করেন। ধর্মীয় স্বাধীনতার দেশে এমন আইন প্রণয়নকে বিশ্লেষকেরা বলছেন ‘নজিরবিহীন বৈষম্য’।
টেক্সাসের বাইরেও শরিয়াহবিরোধী আতঙ্ক ছড়ানোর ঘটনা বহু পুরোনো। টেনেসির মারফ্রিসবোরোতে একটি মসজিদের বিরোধীরা দাবি করেছিল, ইসলাম কোনো ধর্মই নয়—তাই মুসলমানরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সংশোধনীর অধীনে ধর্মীয় স্বাধীনতার সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য নন। মিশিগানের ডিয়ারবর্নকে ‘শরিয়াহ আইনে দখলকৃত শহর’ বলে অসংখ্য ভুয়া ভিডিও ছড়ানো হয়েছে। যদিও তথ্য যাচাই করে এসব অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও ইসলাম ও মুসলমানদের নিয়ে অপপ্রচার চালানো থামেনি।
নিউ ইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানিও এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও ধর্মবিদ্বেষের শিকার। তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার সময় দাবি করা হয় যে তিনি নির্বাচিত হলে ‘শরিয়াহ শাসন’ প্রতিষ্ঠা করবেন। অথচ তাঁর রাজনৈতিক এজেন্ডার একটিতেও ধর্মীয় আইন বা ইসলামের কোনো উল্লেখ নেই। গণপরিবহন সংস্কার, আবাসন নিরাপত্তা ও পুলিশের জবাবদিহি—এগুলোই তাঁর মূল প্রতিশ্রুতি ছিল।
মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণায় শুধু রিপাবলিকান রাজনীতিকরাই নয়, কিছু গণমাধ্যম, উদারপন্থী রাজনীতিবিদ এবং এমনকি নাগরিক স্বাধীনতার সংগঠনগুলোর কিছু অংশও জড়িত রয়েছে বলে বিশ্লেষণ উঠে এসেছে। এই প্রচারণা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতারই বহিঃপ্রকাশ—যেখানে মুসলমানদের সন্দেহভাজন নাগরিক হিসেবে উপস্থাপন, তাদের ধর্মীয় চর্চাকে হুমকি হিসেবে দেখানো এবং শরিয়াহকে দানবীয়ভাবে উপস্থাপন করে ভোটব্যাংক তৈরি করা হয়।
বাস্তবে ‘শরিয়াহ’ শব্দটির অর্থই ভিন্ন। আরবি ভাষায় শরিয়াহ মানে নৈতিকতা, ন্যায়বিচার, কল্যাণ এবং আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধতার পথে চলা। জীবন, বুদ্ধি, সম্পত্তি, বিশ্বাস ও মানবিক মর্যাদা রক্ষাই এর কেন্দ্রীয় লক্ষ্য। শরিয়াহ কোনো বিদেশি আইনব্যবস্থা নয়—বরং ন্যায়বিচার, জনস্বার্থ এবং প্রথার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই নৈতিক কাঠামো পশ্চিমা আইনব্যবস্থার সঙ্গেও ব্যাপক সাদৃশ্যপূর্ণ। নর্থ ক্যারোলিনা ল–রিভিউতে প্রকাশিত গবেষণায় অধ্যাপক জন মাকডিসি দেখিয়েছেন, ইংরেজি সাধারণ আইনের বহু ভিত্তিমূলক কাঠামো ইসলামি আইন থেকে অনুপ্রাণিত।
কিন্তু রাজনৈতিক লাভের চেয়ে বড় আর কিছু হয়তো কিছু অংশের কাছে নেই। তাই শরিয়াহ নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি, মুসলমানদের সন্দেহভাজন নাগরিক হিসেবে উপস্থাপন এবং আইন ব্যবহার করে তাদের ধর্মীয় প্রকাশকে সংকুচিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী ও সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার যখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন অ্যাবটের মতো প্রভাবশালী রাজনীতিকদের এমন পদক্ষেপ দেশটির সামগ্রিক সামাজিক আস্থা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বহুত্ববাদী মূল্যবোধকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।