প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলের ব্যাপক বিমান হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সোমবার রাতের এই হামলা মূলত ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর অন্যতম শক্তিশালী সামরিক ইউনিট ‘রাদওয়ান ফোর্স’-এর অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী। ইসরাইল জানায়, রাদওয়ান ফোর্সের যেসব স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও বাস্তবায়ন করা হতো, সেগুলোকেই প্রধানত নিশানা করা হয়েছে। তবে লেবাননে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এখনও জানা যায়নি, যা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
গত বছরের শেষ দিকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে সীমান্ত পরিস্থিতি ধীরে ধীরে অবনতি ঘটছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এবং পূর্ব লেবাননের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় হামলা চালানো হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, রাতের বেলায় হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দে চারদিক কেঁপে ওঠে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় বিস্তীর্ণ অঞ্চল। আহতদের চিৎকার, আতঙ্কে ছুটোছুটি করা পরিবার—এ যেন মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আরেক করুণ অধ্যায়।
ইসরাইল বলছে, হিজবুল্লাহ সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি তৈরি করছে। বিশেষ করে রাদওয়ান ফোর্সের যোদ্ধারা উত্তর ইসরাইলের ভেতরে অনুপ্রবেশের পরিকল্পনা করছে—এমন দাবি করে ইসরাইল হামলার যৌক্তিকতা তুলে ধরেছে। এজন্য লেবানন সীমান্তে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন রাখা হয়েছে। ইসরাইলি বাহিনীর দাবি, প্রয়োজন হলে আরও বড় ধরনের অভিযান চালানো হতে পারে।
কিন্তু লেবাননের রাজনৈতিক মহল ইসরাইলের এই অবস্থান মানতে নারাজ। তাদের মতে, ইসরাইল নিয়মিতভাবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই পক্ষের এই উত্তেজনা যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তাহলে পুরো অঞ্চল আবারও বৃহৎ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। এর প্রভাব শুধু লেবানন কিংবা ইসরাইলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করবে।
হিজবুল্লাহ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে সংস্থাটির ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র বলছে, তারা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন হলে “দৃঢ় জবাব” দেওয়া হবে। লেবাননের সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ চরমে। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বহু পরিবার আবারও যুদ্ধের আশঙ্কায় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত বলেছেন, ইসরাইল-হিজবুল্লাহর এই নতুন উত্তেজনা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অনির্দেশ্য পরিস্থিতি তৈরি করছে। উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শন এবং যুদ্ধবিরতির চুক্তি বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, দু’পক্ষই এখন শক্তি প্রদর্শনের কৌশলে বেশি মনোযোগী, যা আগামী দিনগুলোকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
এদিকে লেবাননের সাধারণ মানুষ মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশটি নতুন কোনো সংঘাত সহ্য করার মতো অবস্থায় নেই। দক্ষিণ লেবাননের অনেক এলাকায় এখনও আগের হামলার ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়নি। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ নেই, অর্থনীতি ধ্বংসপ্রায়। এর মধ্যেই নতুন হামলা যেন তাদের বেঁচে থাকার লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত—বিশেষ করে গাজায় ইসরাইলি অভিযানের প্রেক্ষাপটে—হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের সংঘাত নতুন মাত্রা পাচ্ছে। কেউই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চাইছে না, অথচ পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত সেই দিকেই ঠেলে দিচ্ছে। হিজবুল্লাহর দিক থেকে আসা বার্তায় পরিষ্কার যে, তারা সীমান্তে ইসরাইলের আগ্রাসন “চুপচাপ বসে দেখবে না”। অন্যদিকে ইসরাইলও তাদের নিরাপত্তাজনিত দুশ্চিন্তা মোকাবিলায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে লেবানন সীমান্ত যেন মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষরা মনে করছেন, একের পর এক হামলা যেন তাদের জীবনে বারবার একই দুঃস্বপ্ন ফিরিয়ে আনে। বোমার শব্দ থেমে গেলেও ভয় ও অনিশ্চয়তার ভারী ছায়া তাদের মাথার ওপর ঘুরপাক খাচ্ছে।
পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে বিস্তৃত যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। আর তাই আন্তর্জাতিক মহল দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, এখনো সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান নয়। বরং প্রতিদিনের হামলা, প্রতিশোধের হুমকি, শক্তি প্রদর্শনের কৌশল মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
লেবাননে সোমবার রাতের এই বিমান হামলা আবারও মনে করিয়ে দিল, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি এখনও অনেক দূরের স্বপ্ন। সাধারণ মানুষই এখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। যারা কোনো রাজনৈতিক লড়াইয়ের পক্ষ নয়, অথচ প্রতিদিনই বাঁচা-মরার ভয় নিয়ে নতুন দিনের অপেক্ষায় থাকে।