এআই–সমৃদ্ধ স্টেলথ ক্ষেপণাস্ত্রে জোর দিচ্ছে ইরান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩০ বার
এআই–সমৃদ্ধ স্টেলথ ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নে ইরানের নতুন ঘোষণা

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

তেহরানের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা–সমৃদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি। মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক শক্তি–রাজনীতির প্রতিযোগিতার মধ্যেই এমন ঘোষণা দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর (আইআরজিসি) স্থলবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মাদ পাকপৌর। তিনি জানিয়েছেন, ইরান এখন থেকে ক্ষেপণাস্ত্রে স্টেলথ প্রযুক্তি ও উন্নতমানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেবে এবং এই উদ্যোগ সামরিক সক্ষমতাকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করবে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানায়, শিক্ষার্থী দিবস উপলক্ষে তেহরানের ইমাম হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে জেনারেল পাকপৌর এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন। তার ভাষায়, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার কেবল সামরিক শক্তির প্রকাশই নয়, বরং যুদ্ধের ময়দানে নিয়ন্ত্রণ, কৌশলগত সুবিধা, লক্ষ্যভেদী আঘাত এবং দ্রুত পরিস্থিতি বিশ্লেষণের সক্ষমতার ওপরই ঝুঁকে থাকে মূল বাস্তবতা। এই প্রেক্ষাপটেই ইরান চায়, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধ–সরঞ্জামে এমন সব প্রযুক্তি সংযুক্ত করতে, যা প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে আরও কার্যকর হবে।

জেনারেল পাকপৌর বলেন, “আজকের বিশ্বে প্রযুক্তি শুধু উন্নয়ন নয়, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রধান স্তম্ভ। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে নজরদারি, আঘাত হানা এবং প্রতিরক্ষা—সব ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাস্তব পরিবর্তন আনতে সক্ষম। তাই আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থায় এই প্রযুক্তির প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। শত্রুরা আজ জানে, ইরানের ক্ষমতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সুস্পষ্ট, সংগঠিত ও কার্যকর।”

তার বক্তব্যে ২০২৪ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি বলেন, ওই সংঘাতে ইরান এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছিল, যারা বিশ্বের সর্বাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি নিজেদের হাতে রেখেছিল বলে দাবি করে। কিন্তু বাস্তবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও প্রতিরোধশক্তির কাছে তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে শত্রুপক্ষকে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির আবেদন জানাতে বাধ্য হতে হয়। জেনারেল পাকপৌরের দাবি, সেই যুদ্ধই প্রমাণ করেছে—ইরান কোনো পক্ষের হুমকির সামনে মাথানত করার মতো অবস্থানে নেই।

তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানকে ঘিরে যে ধরনের সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি করা হয়, তা সাম্প্রতিক যোগাযোগ–ব্যবস্থা, নজরদারি প্রযুক্তি এবং দ্রুত–গতির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহারের মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন এক মাত্রা যোগ করবে, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভেদী নির্ভুলতা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি তা প্রতিপক্ষের রাডার এড়িয়ে কৌশলগত মিশন পরিচালনায় আরও দক্ষ হবে।

বিগত কয়েক বছর ধরে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং সামরিক প্রযুক্তির উন্নয়নে অধিক মনোযোগ দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক চাপ থাকা সত্ত্বেও দেশটি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। পশ্চিমা বিশ্ব এবং বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি বলে বিবেচনা করে। অন্যদিকে তেহরান দাবি করে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে আত্মরক্ষামূলক এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার অংশ হিসেবেই তা উন্নয়ন করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষেপণাস্ত্রে এআই প্রযুক্তি যুক্ত হলে সেটি শুধু লক্ষ্য ভেদ করতে সক্ষম হবে না, বরং দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও অর্জন করতে পারে। এতে লক্ষ্যস্থলের গতিবিধি, আবহাওয়া, প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা সামরিক ড্রোনের চলাচল—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে তা নিখুঁত আঘাত করতে সক্ষম হবে। এমন সক্ষমতা কোনো দেশের প্রতিরক্ষা কাঠামোকে নতুন ধাপে নিয়ে যেতে পারে।

এদিকে ইসরায়েল–ইরান উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি পরিস্থিতিকে সবসময়ই অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, ইরানের সামরিক কার্যক্রম, বিশেষত ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের হুমকি। অন্যদিকে ইরান মনে করে, ইসরায়েল ও তার পশ্চিমা মিত্রদের চাপের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

জেনারেল পাকপৌর তার বক্তৃতায় আরও জানান, ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসন হলে তার প্রতিক্রিয়া হবে পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও কঠিন ও বিধ্বংসী। ইরান চায় না সংঘাতে জড়াতে, তবে প্রয়োজন হলে পূর্ণ প্রতিরোধ এবং পাল্টা আঘাত–ক্ষমতা প্রদর্শনে তারা প্রস্তুত।

ইরান সরকারের এই নতুন ঘোষণার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলেও মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, সৌদি আরব এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশসমূহ পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এআই–সমৃদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়ন সামরিক প্রতিযোগিতাকে নতুন রূপ দেবে এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হতে পারে।

ইরানের এই উদ্যোগ তাদের সামরিক শক্তির স্বরূপ এবং রাজনৈতিক অবস্থানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশের নিরাপত্তা কাঠামোতে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, এই ঘোষণাই তার স্পষ্ট প্রমাণ। জেনারেল পাকপৌরের বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূ–রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতের সামরিক কৌশল কোনদিকে যেতে পারে, তারও ইঙ্গিত বহন করে।

ইরান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব মনে করছে, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং সামরিক সক্ষমতার বিস্তার ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং যুদ্ধের বাস্তব ময়দানে ফলাফল নির্ধারণ করতে সক্ষম একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। নতুন ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ইরান সেই নতুন যুগে প্রবেশের পথ আরও সুগম করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত