প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে জেআইসি সেলে গুম ও পৈশাচিক নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী মামলায় তিনজন সেনা কর্মকর্তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে ঢাকা সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে তাদের ট্রাইব্যুনালে আনা হয়।
হাজিরকৃত তিন সেনা কর্মকর্তা হলেন—ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজহার সিদ্দিকী। মামলার প্রধান আসামি হিসেবে অবস্থান করছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং মোট ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে। এছাড়া শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা তারিক আহমেদসহ ১০ জন পলাতক রয়েছেন।
ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ আজ স্টেট ডিফেন্স এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীদের শুনানি গ্রহণ করবেন। গত ৭ ডিসেম্বর চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ১৩ আসামির বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয় এবং চার্জ গঠনের আবেদন করেন। তিনি অভিযোগের বর্ণনায় জানিয়েছেন, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জেআইসি সেলে ২৬ জন ভুক্তভোগীর ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।
মামলার পলাতক আসামিদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার আইনজীবী হিসেবে মো. আমির হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে হাজিরকৃত তিন সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ ২২ অক্টোবর আদালত জারি করেছিলেন।
তিন সেনা কর্মকর্তা, যারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সংস্থার অধীনে দায়িত্বহীনতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালে তাদের হাজির করা হয় আদালতের কড়া নিরাপত্তার মধ্যে, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো যায়।
মানবতাবিরোধী এই মামলার প্রেক্ষাপটে বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক নজরেও রয়েছে। দেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা লক্ষ্য রাখছেন যে, কীভাবে ট্রাইব্যুনাল শাসনামলের অধীনে ঘটে যাওয়া গুম ও নির্যাতনের দায় প্রমাণের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হবে। পলাতক আসামিদের উপস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও স্টেট ডিফেন্সের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ও বেঞ্চের নির্দেশনায় আজকের শুনানি মূলত চার্জ গঠনের প্রক্রিয়া এবং অভিযোগের বৈধতা যাচাইয়ের ওপর কেন্দ্রীভূত। চিফ প্রসিকিউটর চিহ্নিত করেছেন যে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জেআইসি সেলে গুম, নির্যাতন এবং বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ফিজিক্যাল ও মানসিক নির্যাতনের বিষয়গুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রসঙ্গত, এই মামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংস্থার ওপর নির্ভরযোগ্যতা, দায়িত্বশীলতা এবং মানবাধিকার সংরক্ষণের দায়িত্বকে প্রমাণের সুযোগ পাচ্ছে। এই বিচার প্রক্রিয়া শুধুমাত্র তিন সেনা কর্মকর্তার ওপর নয়, বরং দেশের সামরিক কাঠামো ও নিরাপত্তা সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপরও আলো ফেলে।
ভুক্তভোগীদের পরিবার ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই মামলার প্রতি গভীর আগ্রহ দেখাচ্ছে। তারা আশাবাদী যে, ট্রাইব্যুনাল প্রমাণিত তথ্য ও সুনির্দিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে ন্যায্য রায় দেবে। তবে বিচার প্রক্রিয়ার জটিলতা, পলাতক আসামিদের অনুপস্থিতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিষয়টিকে আরও চ্যালেঞ্জপূর্ণ করে তুলেছে।
এই মামলার মাধ্যমে দেশের বিচার ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার দায়িত্বশীলতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে ট্রাইব্যুনাল কক্ষের নিরাপত্তা অত্যন্ত কড়া রাখা হয়েছে, যাতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ শুনানি নিশ্চিত করা যায়।
আদালতের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আজকের শুনানি চলাকালে স্টেট ডিফেন্স, চিফ প্রসিকিউটর এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বিস্তারিত যুক্তি উপস্থাপন করবেন। চিফ প্রসিকিউটর ইতিমধ্যেই ২৬ জন ভুক্তভোগীর ওপর চালানো নির্যাতনের বিষয়গুলো আদালতে তুলে ধরেছেন, যা বিচার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই মামলার ফলাফল কেবল তিন সেনা কর্মকর্তার জন্য নয়, দেশের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর জন্যও দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। আদালতের রায় মানবাধিকার রক্ষা, সুশাসন এবং নিরাপত্তা সংস্থার জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।