জাতীয় স্মৃতিসৌধ: বীর শহীদদের শ্রদ্ধা ও জাতীয় অহংকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫৯ বার
জাতীয় স্মৃতিসৌধ বাংলাদেশ

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে নির্মিত হয়েছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা এবং মহান বিজয়কে স্মরণ করতে এই স্থাপনা দেশের মানুষের মনে গভীর অনুরণন সৃষ্টি করে। এটি শুধু বীর শহীদদের স্মৃতিচারণের কেন্দ্র নয়, বরং জাতীয় অহংকার ও ন্যায়ের প্রতি প্রতিশ্রুতির প্রতীক। শোষণ, অবিচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রতীক হিসেবেও জাতীয় স্মৃতিসৌধের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে।

ঢাকার কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে, সাভার উপজেলার ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বাঁ পাশে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে নির্মিত এই কমপ্লেক্স ৩৪ হেক্টর, অর্থাৎ ৮৪ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। কমপ্লেক্সটির চারপাশে আরও ১০ হেক্টর সবুজ ভূমি রয়েছে, যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। জাতীয় স্মৃতিসৌধের মূল উদ্দেশ্য স্বাধীনতার জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা এবং নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের প্রতি সচেতন করা।

মূল সৌধটি নির্মাণ করা হয়েছে সাতটি ত্রিভুজাকৃতির দেয়াল দিয়ে, যা অসমান উচ্চতা ও স্বতন্ত্র ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই স্তম্ভগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচু ভিত্তির ওপর সর্বোচ্চ স্তম্ভ নির্মিত হয়েছে, আবার সর্বোচ্চ ভিত্তির ওপর যে স্তম্ভটি রয়েছে, সেটি তুলনামূলকভাবে কম উচ্চতার। স্মৃতিসৌধের শীর্ষ বিন্দুর উচ্চতা ১৫০ ফুট। এই নকশা নির্মাণের জন্য জাতীয় প্রতিযোগিতায় ৫৭ জন স্থপতি অংশগ্রহণ করেছিলেন, যার মধ্যে মইনুল হোসেনের নকশাটি নির্বাচিত হয়। এই নকশা ১৯৭৮ সালে নির্বাচিত হয় এবং তার ভিত্তিতে এই স্থাপনা গড়ে ওঠে।

স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্সের সামনে রয়েছে কয়েকটি গণকবর এবং একটি জলাশয়। স্তম্ভের প্রতিফলন ঘটে এই কৃত্রিম হ্রদে। প্রধান সৌধ পর্যন্ত পৌঁছাতে একটি সেতুর মাধ্যমে পার হতে হয়, যা কৃত্রিম হ্রদের ওপর তৈরি। কমপ্লেক্সের পথগুলো উঁচু-নিচু হিসেবে পরিকল্পিত, যা দীর্ঘ স্বাধীনতা-সংগ্রামের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত। স্মৃতিসৌধে সাতটি জোড়া দেয়াল রয়েছে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের প্রতীক। এই সাতটি দেয়াল ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৫৬, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯ এবং ১৯৭১ সালের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলিকে স্মরণ করে।

জাতীয় স্মৃতিসৌধের নির্মাণ কার্যক্রম তিনটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। প্রথম পর্যায়ে, ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর ভূমি সংগ্রহ ও রাস্তা নির্মাণ করা হয়। এই পর্যায়ে খরচ হয় ২৬ লাখ টাকা। দ্বিতীয় পর্যায়ে, ১৯৭৪ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত গণকবর, হেলিপ্যাড, পার্কিং, পেভমেন্ট ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়, যার ব্যয় ছিল ৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। তৃতীয় পর্যায়ে কৃত্রিম হ্রদ, সবুজ উদ্যান, ক্যাফেটেরিয়া, হাউজিং ও প্রধান স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়, যার ব্যয় হয়েছে ৮৪৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এই পর্যায়ে কাজের তদারক ও তত্ত্বাবধান করেছে বাংলাদেশ সরকারের গণপূর্ত বিভাগ।

প্রতি বছর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধ ফুলে ফুলে ভরে যায়। দেশব্যাপী মানুষ এখানে এসে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়, ফুল চড়িয়ে স্মৃতিচারণ করে এবং দেশের মুক্তির জন্য যারা প্রাণ দিয়েছে তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এই দুটি দিনে জাতীয় স্মৃতিসৌধ সর্বস্তরের মানুষের মিলনমেলা ও দেশপ্রেমের প্রতিফলন হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

স্মৃতিসৌধ শুধু অতীতকে স্মরণ করানোর নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রজন্মকে স্বাধীনতার মূল্য বোঝানোর প্রতীক। এটি আমাদের সাহস, শৌর্য, একতা ও ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি স্তম্ভ, দেয়াল ও জলাশয়ের নকশা স্বাধীনতার সংগ্রামের দীর্ঘ ও পবিত্র পথের স্মারক। সাভারের এই কমপ্লেক্স বাংলাদেশের মানুষের মনে জাতীয় অহংকার ও ইতিহাসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার অনুভূতি সৃষ্টি করে।

জাতীয় স্মৃতিসৌধ আমাদের শেখায় যে স্বাধীনতা সহজে অর্জিত হয়নি, তা এক অনির্বাণ সংগ্রামের ফল। এটি দেশের প্রতিটি নাগরিককে দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ এবং বীরত্বের মূল্য শেখাতে অব্যাহত রাখে। দেশের মানুষের কাছে এটি চিরকাল স্মরণীয় থাকবে, কারণ এখানে প্রতিটি আঙ্গিনার, প্রতিটি স্তম্ভের মধ্যে লুকানো আছে সেই ইতিহাস যা আমাদের স্বাধীনতার মর্ম স্পর্শ করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত