প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাপানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উপকূলে সোমবার রাতের একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কমপক্ষে ৩৩ জন আহত হয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষকে তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়েছে। ভূমিকম্পটি স্থানীয় সময় রাত ১১টা ১৫ মিনিটে আওমোরি অঞ্চলের উপকূলে আঘাত হানে। ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭.৫, যা জাপানের আবহাওয়া সংস্থাকে সতর্ক করে দেয় এবং সুনামি সতর্কতা জারি করতে বাধ্য করে। পরে সেই সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।
প্রাথমিকভাবে জানা যায়, ভূমিকম্পে কোনো বড় ধরনের ধ্বংসের খবর পাওয়া যায়নি। তবে অনেক সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিছু বাড়ি আগুনে আক্রান্ত হয়েছে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্ধার ও সাহায্যের ব্যবস্থা শুরু করেছেন। আহতদের মধ্যে হোক্কাইডো দ্বীপে একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা শুরুতে ৩০ জন জানানো হলেও সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী তা বেড়ে ৩৩ জনে দাঁড়িয়েছে।
ভূমিকম্পের মাত্রা এতটা শক্তিশালী ছিল যে সাগরে তিন মিটার পর্যন্ত সুনামির প্রাথমিক সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় সরকার ৯০ হাজার পরিবারের প্রতি তাদের বাড়ি দ্রুত ছাড়ার এবং নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ঢেউয়ের উচ্চতা ছিল মাত্র ৭০ সেন্টিমিটার, যার কারণে বৃহৎ ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবু, বিপর্যয়ের প্রভাব রোধ করতে বুলেট ট্রেনের চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়, যাতে রেলপথের সম্ভাব্য ক্ষতি পরীক্ষা করা যায়।
ভূমিকম্পের সময় আমোরি অঞ্চলের প্রায় ২৭০০ বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হয়েছে, তবে এখনও ৪০টির কম বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, রাস্তায় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে এবং অন্তত একটি গাড়ি ফাটলে পড়ে আছে। অনেক স্থানে জানালার কাচ ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছে, যা স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
তোহোকু ইলেকট্রিক পাওয়ার জানায়, আওমোরির হিগাশিদোরি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পাশের মিয়াগি ওনাগাওয়া কেন্দ্র—দুটিতেই কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি। প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আগামী এক সপ্তাহ জাপানের আবহাওয়া সংস্থা ও স্থানীয় সরকারের তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং কাঁপুনি অনুভব হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখা জরুরি।
২০১১ সালের ৯ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প এবং তার পরে সৃষ্ট সুনামির কথা জাপানি জনগণ আজও ভুলতে পারেনি। সেই ঘটনার কারণে প্রায় ১৮,৫০০ মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়েছিলেন এবং ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে। জাপান প্রশান্ত মহাসাগরের “রিং অব ফায়ার”-এর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
জাপানের ভূমিকম্প ও সুনামি সতর্কতার ব্যবস্থা অনেক দ্রুত এবং সুসংগঠিত হলেও, প্রতিটি ভূমিকম্প স্থানীয় মানুষ এবং প্রশাসনের জন্য একটি পরীক্ষা হিসেবে আসে। বিশেষ করে শীতকালে, তাপমাত্রা হিমাঙ্কের কাছাকাছি থাকার কারণে উদ্ধার কার্যক্রমে চ্যালেঞ্জ বাড়ে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে জাপানি জনগণ পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে সতর্ক থাকায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
জাপানের এই ভূমিকম্প আমাদের জন্যও একটি শিক্ষা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য প্রস্তুত থাকা, তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা এখান থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। বর্তমানে, স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করছেন এবং আহতদের চিকিৎসা, ঘরবাড়ি ক্ষতি নিরীক্ষণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করছেন।
এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কিত থাকলেও, সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ এবং সুনামি সতর্কতার কার্যক্রমে অনেক পরিবারকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করা গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের ভূমিকম্প ভবিষ্যতেও হতে পারে, তাই জাপানের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে মানুষকে সবসময় সতর্ক থাকার প্রয়োজন।
এই ভূমিকম্প এবং সুনামি সতর্কতা বিষয়ক ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশও এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর সংবেদনশীলতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।