জাকার্তায় বহুতল ভবনে ভয়াবহ আগুনে অন্তত ২০ প্রাণহানি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩০ বার
ইন্দোনেশিয়ায় বহুতল ভবনে আগুন, নিহত অন্তত ২০

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা আবারও একটি ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হলো। নগরীর কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত একটি সাততলা বাণিজ্যিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে। এখনো নিখোঁজ ও আটকে পড়া ব্যক্তিদের সন্ধানে উদ্ধারকর্মীরা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। আগুন নেভানো হলেও ভবনের ভেতর এখনো ধোঁয়া ও জ্বলন্ত অবশিষ্টাংশের কারণে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

মঙ্গলবার দুপুরের দিকে সেন্ট্রাল জাকার্তার ব্যস্ত এলাকার এই ভবনটির প্রথম তলায় হঠাৎ করেই আগুনের সূত্রপাত হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও অফিসকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন প্রথমে একটি কক্ষ থেকে শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা ভয়াবহ রূপ নেয় এবং একের পর এক তলায় ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভবনটি কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলে ভবনের ভেতরে থাকা কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে অনেকেই জীবন বাঁচাতে জানালা ভেঙে বা অস্থায়ী মই ব্যবহার করে নিচে নামার চেষ্টা করেন।

ভবনটিতে জাপানি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টেরা ড্রোন কর্পোরেশনের ইন্দোনেশীয় কার্যালয় ছিল। অগ্নিকাণ্ডের সময় অনেক কর্মী মধ্যাহ্নভোজে ছিলেন, আবার কেউ কেউ বাইরে অবস্থান করছিলেন। যারা ভেতরে ছিলেন, তাদের কেউ আগুন দেখেই সিঁড়ির দিকে ছুটে যান, কেউবা ধোঁয়ার কারণে দিশেহারা হয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সারা ভবনজুড়ে আতঙ্কিত মানুষের চিৎকার, ধোঁয়া আর ছুটোছুটি সৃষ্টি হয়েছিল এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিবেশ।

জাকার্তা পুলিশের প্রধান সুসাতিও পুরনোমো কনড্রো সাংবাদিকদের জানান, বিকেলের মধ্যেই মৃতের সংখ্যা অন্তত ২০–এ পৌঁছেছে। কিছু মানুষের মরদেহ ভবনের বিভিন্ন কোণ থেকে উদ্ধার করা হয়। অনেকে ধোঁয়ায় অচেতন হয়ে পড়েছিলেন, পরে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকারী দল আশঙ্কা করছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মরদেহ থাকতে পারে। তাই ভবনের প্রতিটি ফ্লোর সতর্কতার সঙ্গে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আগুন এখন নিয়ন্ত্রণে এবং উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে। ভবনের কাঠামোগত ক্ষতি বড় ধরনের হওয়ায় ভেতরে প্রবেশ করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবু বিশেষ দলগুলো প্রতিটি কক্ষ খতিয়ে দেখছেন—কেউ আটকেপড়ে আছে কি না। যেসব কর্মী বা কর্মকর্তা এখনো নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন, তাদের সন্ধানেও কাজ চলছে।

স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভবনের প্রতিটি তলা থেকে ধোঁয়া উঠছে এবং উদ্ধারকর্মীরা দমকল বাহিনীর সহায়তায় ভবনের বিভিন্ন অংশ কেটে ও ভেঙে আটকে পড়া মানুষদের বের করে আনছেন। কিছু ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজনকে ভবনের ভেতর থেকে বের করে বডি ব্যাগে তুলে এম্বুলেন্সে নেওয়া হচ্ছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত মানুষের মধ্যে শোক, আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ভবনের প্রথম তলায় থাকা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থেকে সৃষ্ট শর্ট সার্কিটই এ ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে। দমকল বাহিনী জানিয়েছে, ভবনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকলেও সেগুলো কার্যকর ছিল কি না—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়া নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যকর না থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, আর এখানে ঠিক তেমনই ঘটেছে বলেই তারা মনে করছে।

ঘটনার পর ভবনটির চারপাশে ভিড় জমে যায়। অনেকেই তাদের পরিচিতজন ও সহকর্মীদের খোঁজে ছুটে যান। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবনে প্রায় শতাধিক মানুষ ছিলেন। অনেকে বাঁচতে গিয়ে ছাদে আশ্রয় নেন, পরে হেলিকপ্টারের সাহায্যে তাদের নামানোর পরিকল্পনা হলেও ধোঁয়ার কারণে তা সম্ভব হয়নি।

জাকার্তা সিটি করপোরেশন ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুতর বলে মন্তব্য করেছে। তারা জানিয়েছে, শহরের প্রতিটি বাণিজ্যিক ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনরায় যাচাই করা হবে। গত কয়েক বছরে জাকার্তায় বেশ কয়েকটি বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, যা নগরীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে নতুনভাবে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।

মানবিক দিক থেকেও এ দুর্ঘটনা গভীর বেদনাদায়ক। নিহতদের স্বজনরা হাসপাতালে এবং ঘটনাস্থলে ভিড় করে শোক প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ এখনো প্রিয়জনের খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছেন, কারণ কিছু মরদেহ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে এবং পুরো ঘটনার তদন্তে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মানুষের জীবননাশ, ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ এবং প্রযুক্তিনির্ভর একটি প্রতিষ্ঠানে এমন অগ্নিকাণ্ড ইন্দোনেশিয়ার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা স্থাপন, প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মহড়া ছাড়া এমন দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়।

জাকার্তার এই অগ্নিকাণ্ড কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং মহানগরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির এক নতুন সতর্কবার্তা। তদন্তের ফলাফলে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিললেও, নিহতদের পরিবারগুলোর শোক কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত