ইউরোপকে অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কারের আহ্বান ট্রাম্পের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬১ বার
ট্রাম্প নির্বাচন কারচুপির অভিযোগ

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতি কঠোর করার যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা ইতোমধ্যেই দেশটিতে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নতুন প্রশাসনের নির্দেশনায় অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেপ্তার, আটক এবং বহিষ্কারের হার বেড়েছে কয়েকগুণ। এবার যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই নয়, ইউরোপকেও একই পথে হাঁটার পরামর্শ দিয়েছেন ট্রাম্প। এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, অভিবাসীদের কারণে ইউরোপ দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং কার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে মহাদেশটির অনেক দেশের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইউরোপ ‘রাজনৈতিকভাবে সঠিক’ হতে চাওয়ার কারণে শরণার্থী ও অবৈধ অভিবাসন ইস্যুতে প্রয়োজনীয় কঠোর অবস্থান নিতে পারছে না। তার মতে, এই দুর্বলতা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “যদি এভাবেই চলতে থাকে, আমি মনে করি ইউরোপের অনেক দেশই আর কার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে পারবে না।”

ট্রাম্প বহুদিন ধরেই অভিবাসনবিরোধী অবস্থান নিয়ে সমালোচিত। প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার, মুসলিমপ্রধান কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং অবৈধ অভিবাসীদের আটক নিয়ে কঠোর নীতি গ্রহণ করেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তিনি আরও সরাসরি অবৈধ অভিবাসীদের ‘হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এবার ইউরোপীয় দেশগুলোকেও সেই পথে হাঁটার আহ্বান জানিয়ে আবারও অভিবাসন ইস্যুকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ঠেলে দিলেন।

ইউরোপের অনেক দেশই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিরিয়া, আফগানিস্তান, আফ্রিকার নানা অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা শরণার্থীদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, দারিদ্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বহু মানুষ ইউরোপমুখী হন। তবে অনেক দেশই কঠোর অভিবাসন নীতি গ্রহণ করায় তাদের মধ্যে বেশিরভাগই অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করেন। ফলে ইউরোপে মানবাধিকার, নিরাপত্তা এবং সামাজিক সংহতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

এই অবস্থায় ট্রাম্পের মন্তব্য বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। ইউরোপীয় নেতারা মনে করেন, অভিবাসন সংকট একটি মানবিক সমস্যা, যার সমাধান কেবল কঠোরতা দিয়ে সম্ভব নয়। কিন্তু ট্রাম্প মনে করেন, অবৈধভাবে আসা অভিবাসীদের ‘তাৎক্ষণিক বহিষ্কার’ ছাড়া বাস্তবসম্মত পথ নেই। তিনি বলেন, “যারা অবৈধভাবে আসে, তাদের ফেরত পাঠাতে হবে। নইলে তারা সমাজকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।”

সাক্ষাৎকারে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ নীতিতে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি মূলত নিজের দেশ পরিচালনা নিয়ে ব্যস্ত। তবুও তিনি ইউরোপীয় নির্বাচনে প্রার্থী বা দলগুলোকে সমর্থনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। অতীতে লাতিন আমেরিকার কয়েকজন ডানপন্থি রাজনীতিবিদকে যে সরাসরি সমর্থন দিয়েছেন, তাও তুলে ধরেন তিনি। এ বক্তব্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও ইউরোপের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে?

এ ছাড়াও সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নীতিকে তিনি ‘সমালোচনা’ করেন। ট্রাম্প বলেন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নীতিটি মূলত দাসদের সন্তানদের অধিকার নিশ্চিত করতে তৈরি হয়েছিল, এখন এটি বিত্তবান অভিবাসীদের পুরো পরিবারকে নাগরিক বানানোর একটি ফাঁকফোকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি মনে করেন, এই অধিকার অপব্যবহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের তার নির্বাহী আদেশ আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, এবং ট্রাম্প বলেন, যদি সুপ্রিম কোর্টে তিনি হেরে যান, তবে সেটি হবে “খুব ভয়াবহ একটি ভুল।”

মার্কিন বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এখন এমন এক অবস্থানে আছেন, যেখানে তিনি অভিবাসন ইস্যুকে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো পশ্চিমা বিশ্বে রাজনৈতিক মতাদর্শের কেন্দ্রবিন্দু বানাতে চাইছেন। তাঁর বক্তব্যে একদিকে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট, অন্যদিকে ইউরোপ-আমেরিকা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অভিবাসন নীতি নিয়ে ইউরোপে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নতুন নয়। একদল মানুষ মনে করেন অভিবাসীরা অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে ইতিবাচক প্রভাব রাখেন, অন্যদিকে অভিবাসনবিরোধীরা নিরাপত্তা এবং সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ভয় দেখিয়ে কঠোর নীতি দাবি করেন। ট্রাম্পের বক্তব্য এই বিরোধকে আরও উসকে দিয়েছে।

এখনো পর্যন্ত ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পের মন্তব্য নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেননি। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি-নির্ধারকেরা এর আগে বলেছেন, অভিবাসন ইস্যু আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত, একতরফা কঠোরতার মাধ্যমে নয়। এই অবস্থায় ট্রাম্পের বক্তব্য মহাদেশটির রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

বিশ্ব রাজনীতিতে অভিবাসন ইস্যু আগের চেয়ে আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা যেভাবে বাড়ছে, ভবিষ্যতে অভিবাসন আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বাস্তবতায় ট্রাম্পের ‘অবৈধ অভিবাসী বহিষ্কার’ আহ্বান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে—তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই ইস্যু বিশ্ব কূটনীতি, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নীতির ক্ষেত্রকে নতুনভাবে নাড়া দিতে চলেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত