যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসার নতুন নিয়মে বিপাকে ভারতীয়রা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৪ বার
যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসা

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষ কর্মী ভিসা এইচ-১বিকে কেন্দ্র করে আবারও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে ভারতীয় আবেদনকারীদের মধ্যে। সম্প্রতি মার্কিন সরকার ভিসা যাচাই-বাছাইয়ে নতুন সামাজিক মাধ্যম নীতি যুক্ত করার পর দেশজুড়ে হাজারো আবেদনকারীর সাক্ষাৎকার হঠাৎ বাতিল ও পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। এতে যারা বছরের শেষ দিকে ভিসা প্রক্রিয়া শেষ করে নতুন চাকরি কিংবা পারিবারিক পরিকল্পনায় ছিলেন, তারা বিপাকে পড়েছেন।

মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, ১৫ ডিসেম্বর থেকে এইচ-১বি এবং এইচ-৪ নির্ভরশীল ভিসার জন্য আবেদনকারীদের অনলাইন উপস্থিতি কঠোরভাবে যাচাই করা হবে। আবেদনকারীর সক্রিয় সব সামাজিক মাধ্যম একাউন্ট “পাবলিক” না রাখলে ভিসা প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ ধরা হবে। এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো আরও শক্তিশালী করার অংশ বলে বিবেচিত হলেও, এর পরপরই বিপুল সংখ্যক সাক্ষাৎকার পিছিয়ে দেওয়া শুরু হয়। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শেষের দিকে যেসব আবেদনকারীর সাক্ষাৎকার নির্ধারিত ছিল, তাদের প্রায় সবাইকে নতুন করে মার্চ ২০২৬-এর অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হয়েছে।

ভারতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, যে কেউ নতুন সাক্ষাৎকার তারিখ পেলে সেই তারিখেই কনস্যুলেটে যেতে হবে। পুরনো তারিখে হাজির হলে তাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। দূতাবাসের এমন নির্দেশনায় অনেক আবেদনকারী নিজেদের অসহায় অবস্থায় পড়েছেন। কারণ, নতুন তারিখের কারণে চাকরির যোগদানের সময় পিছিয়ে যাচ্ছে, কারও পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে, আবার অনেকের পরিবারের ভিসা প্রক্রিয়াও অচল হয়ে পড়েছে।

ভারতের শীর্ষস্থানীয় অভিবাসন আইনজীবীরা জানিয়েছেন, নতুন সামাজিক মাধ্যম যাচাইয়ের নিয়মের কারণে কনস্যুলেটগুলোতে অতিরিক্ত সময় লাগছে এবং এ জন্যই সাক্ষাৎকারগুলো হঠাৎ বাতিল করা হয়েছে। তারা বলেছেন, আবেদনকারীর অনলাইন উপস্থিতি— পূর্ববর্তী পোস্ট, মন্তব্য, রাজনৈতিক মতামত, অনুসরণ করা পেজ, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্ক—এসব কিছুই এখন ভিসা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। বহু আবেদনকারী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, অনিচ্ছাকৃতভাবে করা কোনো পোস্টও ভিসা প্রক্রিয়ায় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সামাজিক মাধ্যম যাচাইয়ের এই নতুন নিয়ম যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হলেও এটি আবেদনকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার উপর বড় আঘাত বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, ব্যক্তিগত প্রোফাইল “পাবলিক” করে দিলে আবেদনকারীর ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক তথ্য, কর্মজীবন এবং সামাজিক যোগাযোগ—সবকিছুই উন্মুক্ত হয়ে যায়। বিরক্তি প্রকাশ করে অনেকেই জানিয়েছেন, এটি শুধু অস্বস্তিকর নয়, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কঠোর।

যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করতে ইচ্ছুক ভারতীয় কর্মীদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর H-1B ভিসার বেশিরভাগই ভারতীয়দের মধ্যে বণ্টন হয়। তথ্যপ্রযুক্তি খাত, গবেষণা, প্রকৌশল এবং স্বাস্থ্যসেবা—এসব ক্ষেত্রে ভারতীয়দের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এখন তাদের অধিকাংশই জানতে পারছেন, তাদের চাকরির তারিখ পিছিয়ে যাচ্ছে, ভিসা অনুমোদনে বিলম্ব হচ্ছে এবং অনেকে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নিয়োগকর্তারাও সমস্যায় পড়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের যোগদান তারিখ নিশ্চিত করতে পারছেন না। কর্মী সংকটের কারণে চলমান প্রকল্পগুলোতে বিলম্ব দেখা দিচ্ছে। প্রযুক্তি খাতে আন্তর্জাতিক কর্মীদের ওপর নির্ভরশীলতা অনেক বেশি; ফলে এই বিলম্ব বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় মার্কিন বাজারের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

তবে মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, নতুন নিয়মের সঙ্গে সমন্বয় করতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সময়ের পর সাক্ষাৎকারগুলো পুনরায় নিয়মিত গতিতে সম্পন্ন হবে। তারা আবেদনকারীদের ইমেইল নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন এবং প্রয়োজন হলে কেবল নতুন তারিখ অনুযায়ী কনস্যুলেটে হাজির হতে বলেছেন।

সামাজিক মাধ্যম যাচাইয়ের মাধ্যমে একজন আবেদনকারীর অভিপ্রায়, রাজনৈতিক অবস্থান, নিরাপত্তা-ঝুঁকি বা জননিরাপত্তায় সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ হবে, কিংবা একটি সামাজিক মাধ্যম পোস্টের ভিত্তিতে ভিসা প্রত্যাখ্যান কতটা যুক্তিযুক্ত—এ নিয়ে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

এই নতুন নীতির কারণে অনেকেই এখন সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি কমিয়ে দিচ্ছেন। কেউ পুরনো পোস্ট মুছে দিচ্ছেন, কেউ আবার সম্পূর্ণ নতুন প্রোফাইল তৈরি করছেন। কিন্তু প্রসঙ্গটি আরও বড় প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করছে—একজন আবেদনকারীকে বিচার করা কি তার অনলাইন আচরণের ভিত্তিতে উপযুক্ত? নাকি এটি ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করছে?

নতুন নিয়মকে কেন্দ্র করে ভারতীয়দের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা কেবল সাময়িক নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে ভিসা প্রক্রিয়ায় আরও নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হতে পারে, এবং এসব নিয়ম আরও কঠোর আকার ধারণ করতে পারে। এতে দক্ষ কর্মী অভিবাসনের চিত্র পাল্টে যেতে পারে, বিশেষ করে ভারতীয়দের ক্ষেত্রে, যাদের অভিবাসন প্রবাহ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি শিল্পের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে এসেছে।

এই মুহূর্তে ভারতীয় আবেদনকারীদের মধ্যে একমাত্র প্রশ্ন—এই নিয়মের প্রভাব কতদিন স্থায়ী হবে, এবং তারা কি প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ পাবেন? উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। তবে অনিশ্চয়তার এই সময় পার করে সামনে ভিসা প্রক্রিয়া আবারও স্বাভাবিক হতে পারে—এমনটাই আশা করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত