প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে আজ যুক্ত হলো গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটায় সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪–এ অনুষ্ঠিত হলো সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়–এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ ফিতা কেটে এই নতুন সচিবালয়ের কার্যক্রমের সূচনা করেন। দেশের বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত বিকাশে এই সচিবালয়কে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে আরও শক্তিশালী করবে।
গতকাল এক বিবৃতিতে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানিয়েছিল, আজকের এই উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের বহুদিনের প্রত্যাশা পূরণ হলো। একইসঙ্গে এটি রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের ভারসাম্য রক্ষায় একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে ধারণা করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগটি আকস্মিক নয়; বরং দীর্ঘদিনের আইনি আলোচনার ফল। এর অংশ হিসেবে গত বছরের ২৭ অক্টোবর প্রধান বিচারপতির দপ্তর থেকে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একটি বিস্তারিত প্রস্তাব পাঠানো হয়। সেই প্রস্তাবে সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদের লক্ষ্য পূরণে হাইকোর্ট বিভাগের তত্ত্বাবধানে সকল অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় গঠনের যুক্তি তুলে ধরা হয়। সেখানে সচিবালয়ের খসড়া অধ্যাদেশ, অর্গানোগ্রাম এবং রুলস অব বিজনেস সংস্কারের সম্ভাব্য নির্দেশনা যুক্ত ছিল।
পরে ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। তারই ধারাবাহিকতায় ৩০ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির নির্দেশে জারি হয় ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’। এই অধ্যাদেশ জারির মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক কাঠামো পায়।
নতুন সচিবালয়ের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ এতদিন বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যকার প্রশাসনিক নির্ভরতা বিভিন্ন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করছিল। এখন প্রধান বিচারপতির সরাসরি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত সচিবালয় বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণ, জনবল ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্প, আর্থিক পরিকল্পনা ও দপ্তর পরিচালনায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
অধ্যাদেশ জারির পর সচিবালয়ের জন্য ৪৮৯টি নতুন পদ অনুমোদিত হয়েছে, যার মধ্যে কর্মকর্তা পর্যায়ে ১০৭টি এবং সহায়ক কর্মচারী পর্যায়ে রয়েছে ৩৮২টি পদ। সচিবালয়ের প্রথম সচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী, যিনি রেজিস্ট্রার জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তার নেতৃত্বে সচিবালয়ের কাজ ইতোমধ্যে গতি পেয়েছে এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, এই সচিবালয় গঠন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অর্জনের বাস্তব অগ্রগতি। অধস্তন আদালতের তদারকি, বিচারকদের বদলি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় এখন সুপ্রিম কোর্ট আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে। এতে বিচারিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষা, বিচারপ্রার্থীদের সুবিধা বৃদ্ধি এবং মামলাজট নিরসনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় আজকের উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। বিচারপতি, আইনজীবী, গবেষক, সাংবাদিক ও আদালত সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক। অনেকেই মনে করেন, এই উদ্যোগ বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামোর দিকে এগিয়ে নেবে।
বিচার বিভাগের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টরা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এই সচিবালয় কার্যকর হলে বিচার ব্যবস্থার স্বাতন্ত্র্য নতুন মাত্রা পাবে। ভবিষ্যতে এটি অধস্তন আদালতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নীতি নির্ধারণে স্বচ্ছতা এবং বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আজকের উদ্বোধনের মাধ্যমে যে কাঠামোগত পরিবর্তন শুরু হলো, তা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের জন্য এক যুগান্তকারী রূপান্তর। আইনজীবীরা বলছেন, “অবশেষে স্বাধীন ও কার্যকর বিচার বিভাগ গঠনের যে স্বপ্ন বহু বছর ধরে দেখা হয়েছে, তার বাস্তব রূপ দেখা গেল আজ।” নাগরিক সমাজও মনে করছে, বিচার বিভাগের স্বতন্ত্রতা যত দৃঢ় হবে, আইনের শাসন তত বিস্তৃত হবে—যা গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় উদ্বোধন নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি বাংলাদেশের বিচার প্রশাসনকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য সূচনা। এই উদ্যোগ দেশকে বিচারিক আধুনিকায়ন ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার নতুন দিগন্তে নিয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা।