প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত, খ্যাতিমান সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। শতবর্ষ আগে বাঙালি মুসলিম সমাজে তিনি আলোকবর্তিকা হয়ে এসেছিলেন। তার সুদূরদর্শী চিন্তা, অদম্য কর্মস্পৃহা ও অনমনীয় সংগ্রাম সমাজের বাধা ও অচলায়তন ভেঙে নারীদের মুক্তির পথ উন্মুক্ত করেছে।
গত ৯ ডিসেম্বর পালিত হলো বেগম রোকেয়া দিবস। ১৮৮০ সালের এই দিনে রংপুরের পায়রাবন্দ গ্রামের এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি এবং ১৯৩২ সালের একই দিনে মৃত্যুবরণ করেন। এই দিনটি বাঙালি মুসলিম নারীদের শিক্ষাজাগরণ ও সমাজ সংস্কারের অগ্রদূত রোকেয়ার স্মরণে প্রতি বছর পালিত হয়ে আসছে।
বেগম রোকেয়া ছিলেন চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক এবং সমাজ সংস্কারক। ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ জরিপে ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেন। তার সাহিত্যকর্মে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা, সমসাময়িক সমস্যা ও নারীর মুক্তি বিষয়ক ধারাবাহিক চিন্তাধারা পরিলক্ষিত হয়।
রোকেয়ার ১৯০৪ সালের প্রবন্ধগ্রন্থ মতিচূর-এ নারীর সমকক্ষতা ও স্বাবলম্বিতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান আছে। তিনি শিক্ষার অভাবকে নারী-পশ্চাৎপদতার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত তার ইংরেজি গ্রন্থ Sultana’s Dream (‘সুলতানার স্বপ্ন’) বিশ্ব নারীজাগরণ সাহিত্যকর্মের অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত, যা ইউনেসকোর ‘ওয়ার্ল্ড মেমোরি’ তালিকায় স্থান পেয়েছে।
বেগম রোকেয়া বুঝেছিলেন, শিক্ষা ছাড়া নারীর মুক্তি অসম্ভব। সেই উপলব্ধি থেকে তিনি নারীশিক্ষার বিস্তারে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সামাজিক বাধা-বিপত্তি, পরিবারের ভ্রান্ত ধারণা এবং নারীদের অন্তঃপুরে আবদ্ধ রাখার প্রথা রোকেয়ার জন্য কোনো বাধা ছিল না। তিনি নিজের হাতে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে মেয়েরা শিক্ষার আলো পায়। সেই যুগে স্কুল প্রতিষ্ঠা করা ছিল একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
রোকেয়া বলেন, “নারী ও পুরুষ উভয়ই সমাজের দুটি চাকা, একটি দুর্বল হলে অগ্রগতি সম্ভব নয়।” তার বিদ্যালয় ও শিক্ষাব্যবস্থা নারীদের আত্মনির্ভরতা, সমমর্যাদা ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বারোপ করেছিল। তিনি নারীর স্বনির্ভরতা ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য সবসময় কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছেন।
বেগম রোকেয়া সাহিত্যকর্মে শুধু নারী শিক্ষার ওপর মনোনিবেশ করেননি, তিনি নারী-পুরুষের সমান অধিকার, সমান মজুরি ও সামাজিক অংশগ্রহণেও জোর দিয়েছেন। তার লেখা ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ ও অন্যান্য প্রবন্ধে এ বিষয়গুলোর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি গৃহকর্মকে শ্রমের মর্যাদা দিয়েছেন এবং নারী শ্রমের মূল্যায়নের দাবিও তুলেছেন।
রোকেয়ার কল্পনাশক্তি ছিল অসাধারণ। Sultana’s Dream-এ তিনি একটি নারী নেতৃত্বাধীন সমাজ কল্পনা করেছেন, যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সমাজকে উন্নত করে। তিনি এমন এক সমাজ চেয়েছিলেন যেখানে নারীরা স্বাধীন, স্বনির্ভর এবং শিক্ষা-বিশ্বাসী। তার ধারণা যুগান্তকারী ও দূরদর্শী ছিল; এমনকি বিদ্যুতের ব্যবহার, কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ও সৌরশক্তি চর্চা তার কল্পনায় বিদ্যমান ছিল, যা তখনকার বিশ্বে প্রায় দূর কল্পনার বিষয় ছিল।
রোকেয়ার সাহসিকতা, দৃঢ়তা ও সংগ্রাম আমাদের শিক্ষা দেয়, যে নারীর উন্নয়ন সমাজের অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি। তিনি সমাজে বিদ্যমান সামাজিক প্রথা, নারীর ওপর সীমাবদ্ধতা ও শিক্ষাবঞ্চনার বিরুদ্ধে নিরলস লড়াই করেছেন। তার প্রতিটি লেখা, প্রবন্ধ ও প্রতিষ্ঠান নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদার জন্য প্রতীক হয়ে আছে।
বেগম রোকেয়া কেবল একজন সাহিত্যিক বা চিন্তকই ছিলেন না, তিনি একজন সমাজ সংস্কারক ও সংগঠকও ছিলেন। তার জীবন ও কর্ম আমাদের শেখায়, নারীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঘরে-বাইরে সমান তালে কাজ করতে হবে। এভাবেই একটি আলোকিত সমাজ ও দেশ গড়ে উঠতে পারে।