শুক্রবার থেকেই মাঠে কঠোর নজরদারিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩২ বার
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আগাম প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে ব্যস্ত সময় পার করছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য সব ধরনের অনিয়ম, অসদাচরণ ও আচরণবিধি লঙ্ঘন রোধে এবার আরও কঠোর হচ্ছে ইসি। এই কঠোরতার অংশ হিসেবে আগামীকাল শুক্রবার থেকেই মাঠে নামছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। আচরণবিধি প্রতিপালন ও নির্বাচনী পরিবেশ সহনীয় রাখতে দেশের প্রতিটি উপজেলায় অন্তত দুজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন, যারা মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯–এর আওতায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারবেন। নির্বাচনী পরিবেশে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে এবং প্রার্থীদের সমতল মাঠ নিশ্চিত করতে এটিকে নির্বাচন কমিশনের অন্যতম শক্তিশালী পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

নির্বাচন কমিশনের উপ-সচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছেন, যেখানে প্রতিটি উপজেলা ও থানায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তফসিল ঘোষণার পরপরই নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে পালন করানো জরুরি হয়ে পড়ে। কারণ এই সময় থেকেই রাজনৈতিক দল, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সমর্থকদের তৎপরতা বাড়তে থাকে, পোস্টার–ব্যানার টানানো, শোভাযাত্রা, মাইকিংসহ নানা প্রচারচেষ্টা শুরু হয়ে যায়। আর এমন পরিস্থিতিতে আচরণবিধির শৃঙ্খলা রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ আচরণবিধি ভঙ্গের প্রবণতা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় তফসিল ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণে নির্বাচন আয়োজনের সময়সূচি, মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই–বাছাই, প্রতীক বরাদ্দ এবং ভোটগ্রহণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার চিত্র তুলে ধরবেন। তার ভাষণের পরই কার্যত নির্বাচনী পরিবেশ শুরু হয়ে যাবে। আর সেই কারণেই শুক্রবার থেকেই মাঠে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, ভোটের দিনসহ ভোট–পরবর্তী দুদিন পর্যন্ত তাঁরা দায়িত্ব পালন করবেন। এই সময়ের মধ্যে নির্বাচনী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখার পাশাপাশি আচরণবিধি ভঙ্গ করলে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

ইতোমধ্যেই তফসিল ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সব ধরনের পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, দেয়াললেখা বা প্রচারসামগ্রী অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ এই নির্দেশনা অমান্য করলে মোবাইল কোর্ট তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগেই বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক পরিমাণে পোস্টার ও ব্যানার লাগানো হয়, যা শুধু পরিবেশ-দূষণই নয়, প্রার্থীদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশও তৈরি করে। এবার ইসি শুরুতেই দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে যেন এমন অসদাচরণে কেউ সুযোগ না পায়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ইসির সমন্বয়ে দেশজুড়ে প্রায় হাজারখানেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন হতে পারেন বলে প্রশাসনিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ছাড়াও অতিরিক্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। তাদের সঙ্গে মাঠে থাকবে পুলিশ, আনসার ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের সহায়ক বাহিনী। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে তারা আচরণবিধি তদারকি করবেন।

নির্বাচনী মাঠে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিতি সবসময়ই নির্বাচনী অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে ভোটের আগে পোস্টার-ব্যানারের প্রতিযোগিতা, মিছিল-মিটিংয়ে উচ্চশব্দের মাইক ব্যবহার, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, প্রার্থীদের সরকারি সুবিধা ব্যবহার, প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানোসহ নানা অনিয়ম সাধারণত বাড়ে। এমন পরিস্থিতিতে আইনের আওতায় তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা থাকলে পরিস্থিতি হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। নির্বাচন কমিশনও তাই এবার তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মাঠে প্রশাসনিক তৎপরতা জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে।

তবে প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য এটি একটি কঠিন দায়িত্ব। কারণ নির্বাচনের সময় চাপ বৃদ্ধি পায় ব্যাপকভাবে। একটি এলাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটার পর্যন্ত সবাই থাকে তৎপর। তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অনেক সময় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। তখন সঠিক বিচার-বিবেচনা কাজে লাগানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে গিয়ে আইন, বিধিমালা ও নির্বাচন কমিশনের পরামর্শমালা সঠিকভাবে অনুসরণ করাই হবে মূল চাবিকাঠি।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

অন্যদিকে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের পক্ষ থেকেও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কার্যক্রমের প্রতি কড়া নজর থাকবে। নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে তাদের প্রয়োজনে ভিডিও রেকর্ডিং, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনগত বৈধতা নিশ্চিত করে পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ নির্বাচনের সময় যেকোনো পক্ষ দাবি তুলতে পারে যে তাদের বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যে কারণে পরবর্তীতে আপত্তি ও অভিযোগ জমা দেয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে। নির্বাচন কমিশন তাই মাঠের কর্মকর্তাদের উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিবেদন পাঠাতে বলেছে।

এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে নানা উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা দেখা গেলেও আচরণবিধি কঠোরভাবে পালন করানোর উদ্যোগকে সাধারণ মানুষ ইতিবাচকভাবেই দেখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে লিখছেন, নির্বাচনের আগেই যদি দেশজুড়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি পায়, তাহলে সহিংসতা, সংঘর্ষ এবং উত্তেজনা অনেকটাই কমে আসবে। প্রার্থীরাও আচরণবিধির বাইরে কোনো পদক্ষেপ নিতে সাহস পাবেন না। এ ধরনের সচেতনতা নির্বাচনী পরিবেশকে আরও স্বচ্ছ ও সহনীয় করে।

এখন দেশের চোখ আজকের তফসিল ঘোষণার দিকে। সেই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই নির্বাচনী মাঠে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করবে। আর সেই মাঠের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও শুদ্ধতার দায়িত্বে থাকবেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। তাদের উপস্থিতি নির্বাচনের প্রথম দিন থেকেই ভোটার, প্রার্থী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বার্তা ছড়িয়ে দেবে—নির্বাচন কমিশন এবার আচরণবিধি বাস্তবায়নে কোনো ছাড় দেবে না। দেশব্যাপী নির্বাচনী পরিবেশ কতটা স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ থাকে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে মাঠে থাকা এসব কর্মকর্তার কাজের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত