রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের চরম হতাশা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৫ বার

প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া ও ইউক্রেনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ‘চরম হতাশা’ প্রকাশ করেছেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট এক ব্রিফিংয়ে জানান, প্রায় চার বছর ধরে চলতে থাকা এই যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্র যে নতুন পরিকল্পনা দিয়েছে, সেটি নিয়ে দুই পক্ষের সাড়া খুবই দুর্বল। ট্রাম্প মনে করছেন, কেবল আলোচনার মধ্যেই আটকে থাকলে এই যুদ্ধ বন্ধ হবে না; প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ, যা যুদ্ধক্ষেত্রে রক্তপাত কমাবে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় স্থিতি ফিরিয়ে আনবে।

অন্যদিকে কিয়েভ অভিযোগ তুলেছে যে, ওয়াশিংটনের নতুন প্রস্তাব রাশিয়ার স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ইউক্রেনকে ভূখণ্ডগত ছাড় দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থাপিত ২৮ দফার পরিকল্পনার ব্যাখ্যায় ইউক্রেন বলছে, এতে একটি বড় অংশ এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ ও অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের নতুন পরিকল্পনার বেশ কিছু ধারায় সংশোধন আনেনি। ফলে ডনেতস্ক ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ইউক্রেনের সংবিধান ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব অনুযায়ী কোনো ভূখণ্ড বিরোধীর কাছে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয় এবং এ সিদ্ধান্ত জনগণের মাধ্যমে — নির্বাচন বা গণভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হতে পারে।

জেলেনস্কি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে বলা হয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে ডনেতস্ক অঞ্চলের কিছু অংশ থেকে একতরফাভাবে সরে যেতে হবে, যেখানে গঠিত হবে একটি ‘অসামরিকীকৃত মুক্ত অর্থনৈতিক এলাকা’। এই ধারণা তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ এখানে রাশিয়া তার বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে পারবে, অথচ ইউক্রেনকেই নিরস্ত্রীকরণের উদ্যোগ নিতে হবে।

দক্ষিণাঞ্চলে রাশিয়া তার অবস্থান বজায় রাখবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ থাকায় ইউক্রেন মনে করছে, মস্কোর দখলে থাকা অঞ্চলগুলোতে স্থায়ী রুশ উপস্থিতি স্বীকৃতি পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যদিও মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিকল্পনাটি যুদ্ধবিরতি ও ভবিষ্যৎ শান্তিচুক্তির জন্য একটি কার্যকর সূচনা বলেই ভাবা হচ্ছে।

অন্যদিকে উত্তর ইউক্রেনের যেসব অঞ্চল রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে দখল ঘোষণা করেনি, সেসব অঞ্চল থেকে কিছু সেনা সরানোর কথা বলা হয়েছে, যা কিয়েভের কাছে আংশিক ইতিবাচক মনে হলেও সামগ্রিক বাস্তবতায় তা পর্যাপ্ত নয় বলে দাবি করা হচ্ছে।

এই অবস্থায় ইউক্রেন নিজস্ব একটি ২০ দফার পাল্টা শান্তি প্রস্তাব তৈরি করে ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছে। জেলেনস্কি জানান, এই পাল্টা পরিকল্পনায় ডনেতস্ক ও জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক কেন্দ্র বিষয়ে ইউক্রেনের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই পরিকল্পনার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তিনি বলেন, “দুই পক্ষেরই সমান দায়িত্ব থাকা উচিত। আমাদের বাহিনী সরে যাবে — কিন্তু রাশিয়া কেন একই দূরত্বে পিছিয়ে যাবে না? যুদ্ধের ন্যায়সঙ্গত সমাধানের জন্য এটি জরুরি।”

যুদ্ধের চার বছরে ইউক্রেনের বহু শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে জনবসতি শূন্য হয়ে গেছে। লাখ লাখ মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে এবং অসংখ্য নিরীহ মানুষের জীবনহানি ঘটেছে। সংঘাতের প্রতিটি দিন ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি, অবকাঠামো ও মানবিক পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলছে।

রাশিয়া সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ডনেতস্কে অগ্রগতির দাবি করেছে, যদিও কিয়েভ বলছে—অনেক এলাকায় এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অগ্রগতি উভয় পক্ষের আলোচনায় চাপ বাড়ানোর কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করা হতে পারে।

শান্তি প্রচেষ্টা নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো এখনো গভীরভাবে যুক্ত রয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানায়, বর্তমান পরিস্থিতি ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লাইয়েনও বলেন, “আগামী সপ্তাহ হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত শান্তির দিকে বড় অগ্রগতি প্রয়োজন।” তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন কোনো শান্তিচুক্তি করা যাবে না যা ভবিষ্যতের নতুন সংঘাতের বীজ বপন করবে।

যদিও ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চাইছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারকে সরাসরি মস্কো ও কিয়েভের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব দিয়েছেন। জেলেনস্কি মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ক্রিসমাসের আগেই একটি কাঠামোবদ্ধ শান্তি চুক্তি তৈরি করতে চায়, যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তেজনার মধ্যেই কিয়েভে একদিনে দ্বৈত বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে একজন সেনাসদস্য নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন। স্থানীয় প্রসিকিউটর অফিস বলছে, এটি একটি সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে এবং তদন্ত চলছে।

পরিস্থিতি বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ থামানোর যেকোনো উদ্যোগই অত্যন্ত জটিল। কারণ এতে জড়িত রয়েছে একাধিক ভূরাজনৈতিক স্বার্থ, নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশ এবং ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব এবং রাশিয়ার অবস্থান—দুই পক্ষের দাবির ভারসাম্য রক্ষা করা এখন যেকোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ।

তবু অনেকেই মনে করেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু দুই দেশেরই নয়, ইউরোপ ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে বড় ধরনের একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ, তবে তা কার্যকর হবে কিনা—তা নির্ভর করছে শর্তাবলীর প্রতি উভয় পক্ষের আস্থার ওপর। শান্তির পথে অগ্রগতি কতদূর সম্ভব, তা আগামী কয়েক সপ্তাহেই বোঝা যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত