শিক্ষার খরচে হিমশিম পরিবার, ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নেই কাগজ-খাতা থেকে স্কুল ফি কিছুই

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই, ২০২৫
  • ৬১ বার

প্রকাশ : ১০ জুলাই | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়ানোর স্বপ্ন এখন বহু পরিবারের কাছে দিন দিন ভারী হয়ে উঠছে। চারপাশের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে শিক্ষার প্রায় প্রতিটি খাতের ব্যয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে কাগজ, খাতা, বই আর আনুষঙ্গিক স্টেশনারি খরচের লাগামছাড়া উল্লম্ফন। রাজধানী ঢাকার কোনো একটি স্কুলের গেটে ঢুকলেই দেখা যাবে—বই-খাতা আর ব্যাগের ওজনের চেয়েও ভারী হয়ে উঠেছে অভিভাবকের মাসিক হিসাব।

একসময় যে খাতা ৩০ টাকায় কিনতে পারতেন একজন মা বা বাবা, সেই খাতা এখন অন্তত ৫০ টাকা, কোনো কোনো দোকানে তার চেয়েও বেশি। ২০০ পৃষ্ঠার খাতা ৫০ থেকে বেড়ে ৮০-৯০ টাকা, ৩০০ পৃষ্ঠার খাতার দাম ৮০ টাকা থেকে লাফিয়ে গিয়ে ঠেকেছে ১২০ টাকায়। এর পেছনে মূল কারণ—কাগজের দাম। ২০২০ সালে যেখানে প্রতি দিস্তা কাগজ ১৬ টাকায় মিলত, এখন তা গড়ে ৩৫ টাকার বেশি।

বই আর খাতার দাম বাড়লে এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর। রাজধানীর লাকি বুকস অ্যান্ড স্টেশনারির জ্যেষ্ঠ বিক্রয়কর্মী মাহবুব আলম জানালেন, খাতার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ‘৫৫ গ্রাম’ কাগজ। ২০২০ সালে যে কাগজের রিম তিনি কিনতেন হাজার টাকায়, সেটি এখন ২ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে। স্কুলের বইও একই পথে। ২০০ টাকার বই এখন কিনতে হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়।

শুধু খাতা-কলমেই নয়, সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে গিয়ে অভিভাবককে সবচেয়ে বেশি চাপে ফেলছে মাসিক বেতন আর প্রাইভেট পড়ানোর খরচ। রাজধানীর এক নামকরা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বেতন দুই থেকে তিন  হাজার  টাকা হলেও টিউশন শিক্ষকের জন্য প্রতি মাসে গুনতে হচ্ছে ৫ হাজার টাকা। বছরের শুরুতে নতুন খাতার সেট, যাতায়াত খরচ, ইউনিফর্মসব মিলিয়ে শিশুটির জন্যই মাসে ব্যয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। আরেকজনের পরিবারে দুই ভাই-বোনের পড়ালেখার জন্যই মাসে ১৬ হাজার টাকা চলে যাচ্ছে, যা দেশের বহু পরিবারের মাসিক আয়ের চেয়ে বেশি।

সিলেটের এক  অভিভাবক বললেন, সন্তানের পড়ালেখা মানসম্মত করতে চাইলে এত খরচ করতেই হয়, উপায় নেই। অথচ এই খরচ মেটাতে গিয়ে মাস শেষে সংসারের বাকির হিসাব মেলানোই দায় হয়ে যাচ্ছে। একই শহরের আরেক বাবা, মো. বাবুল, যিনি মিরপুরে পিঠা বিক্রি করেন, মাসে সর্বোচ্চ ১২-১৫ হাজার টাকা আয় করেন। এই আয়ে ভাড়া, খাবার আর ওষুধের পর সন্তানের পড়ালেখায় কিছু রাখতে পারাই তার কাছে দুঃস্বপ্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা খরচের লাগামছাড়া বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবে বৈষম্যকেই তীব্র করছে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী মনে করেন, সরকার ফি নির্ধারণে কিছু নির্দেশনা দিলেও বাস্তবে বেসরকারি স্কুলগুলো নানা অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিও স্কুলের বেতন ছাড়া অন্যান্য ফি নির্ধারণ করে দিলেও তা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন, এনজিও পরিচালিত স্কুল কিংবা শহরের বড় বড় প্রাইভেট স্কুলগুলোতে টিউশন ফি ও অন্যান্য ফি গড়ে সরকারি স্কুলের তুলনায় বহু গুণ বেশি। ইউনেসকোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট ২০২২ বলছে, বাংলাদেশে শিক্ষার মোট ব্যয়ের ৭১ শতাংশই বহন করছে পরিবারগুলো। গ্রামের পরিবারের মধ্যে প্রাইভেট পড়ানোর প্রবণতা ২০০০ সালে ছিল ২৮ শতাংশ, ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪ শতাংশে। শহরে এই হার ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৭ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ শিক্ষার গুণগত মানের ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে প্রতিটি পরিবারকে বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে।

সব মিলিয়ে শিক্ষা, যা কখনো একটি দেশের মানুষের সমান অধিকার ও প্রগতির প্রধান চাবিকাঠি হয়ে ওঠে, তা যেন বাংলাদেশে হয়ে যাচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য এক অনাবশ্যক বোঝা। উপবৃত্তি, মিড ডে মিল, সরকারি ফি নিয়ন্ত্রণ নীতি—সবই আছে খাতায়-কলমে। কিন্তু বাস্তবে দামের দৌড়ে হার মানছে পরিবারগুলোর আয়ের সীমা।

অভিভাবকেরা বলছেন, সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে গিয়ে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই, কারণ দেশের সরকারি স্কুলগুলোর আসনসংকট, শিক্ষক ঘাটতি আর শহরাঞ্চলে গুণগত মানের প্রশ্নে বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা কার্যত একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে পরিবারগুলোকে নিত্যদিনই নীরবে এই ব্যয়বহুল লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে, যার শেষ কোথায়—তা কেউই জানে না।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত