প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রিয়াল মাদ্রিদ–বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ক্লাবগুলোর একটি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দলটির পারফরম্যান্স এমন এক সংকট তৈরি করেছে, যা ক্লাবটির সমর্থক ও বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনার ঝড় তুলেছে। ইউরোপিয়ান ফুটবলের মহারণ চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ম্যানচেস্টার সিটির কাছে ঘরের মাঠে ২–১ গোলের পরাজয় শুধু পয়েন্ট টেবিলেই ঝাঁকুনি দেয়নি, কোচ জাবি আলোনসোর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল। লা লিগার শীর্ষে থাকা দলটি নেমে গেছে দ্বিতীয় স্থানে, আর শেষ আট ম্যাচে মাত্র দুইটি জয়ে সমর্থকদের মনেও জন্ম দিয়েছে হতাশা।
কিন্তু মাঠের দুর্বলতার বিপরীতে ড্রেসিং রুমে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। রিয়াল মাদ্রিদের খেলোয়াড়রা এবং ক্লাবের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন, আলোনসোর উপর তাদের আস্থা অটুট। তারা দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে যেতে চায় না এবং মনে করে বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সময় ও স্থিরতা প্রয়োজন।
ঘরের মাঠে সিটির কাছে হারের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ঝড়। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমও একের পর এক বিশ্লেষণে দেখাতে থাকে, কোচের চাকরির চেয়ারে নড়চড় শুরু হয়েছে। অভিযোগ—দলটির খেলার ধরণ আগের মতো ধারালো নয়, আক্রমণে সৃষ্টিশীলতা কম, রক্ষণভাগেও ধারাবাহিকতা নেই। কিন্তু এ বিশ্লেষণের বিপরীতে দাড়িয়েছে রিয়ালের খেলোয়াড়দের একতাবদ্ধ মনোভাব ও কোচের প্রতি অবিচল আস্থা।
ইংল্যান্ড তারকা জুড বেলিংহ্যাম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, আলোনসোর প্রতি খেলোয়াড়দের সমর্থন শতভাগ। তিনি বলেন, “কোচ অসাধারণ একজন মানুষ এবং একজন দারুণ নেতা। আমরা যখন কিছু ম্যাচে ড্র করলাম, তখন নিজেদের ভেতর ভালো আলোচনা হয়েছে। কেউই ভেঙে পড়েনি। দলের ভেতরে যে ইতিবাচক পরিবেশ আছে, সেটিই আমাদের আরও ভালো করবে।”
তার মতে, সমস্যার বড় অংশ এসেছে নিজেদের ভুল থেকে, কিন্তু দল হাল ছাড়েনি। বেলিংহ্যামের কথায় পরিষ্কার, ড্রেসিং রুমে কোনো বিভক্তি নেই—বরং আছে ঐক্য, সংকট কাটিয়ে ওঠার দৃঢ় ইচ্ছা।
রিয়ালের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক থিবাউট কোর্তোয়া জানান, সিটির বিপক্ষে ম্যাচে হারের পর হতাশা থাকলেও কোচের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলোয়াড়দের মনে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি বলেন, “আমরা সবাই এক জিনিসই দেখাতে চেয়েছি—কোচের জন্য খেলছি, তার পরিকল্পনার সঙ্গে আছি। সময়টা ভালো যাচ্ছে না, কিন্তু আমরা লড়াই করছি।”
রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড রদ্রিগোর সঙ্গে আলোনসোর সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন ছিল দীর্ঘদিন। অনেকে মনে করছিলেন, দুজনের মাঝে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু রদ্রিগো নিজেই তা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “সময়টা কঠিন, আমাদের জন্যও, কোচের জন্যও। কিন্তু আমরা দেখাতে চেয়েছি যে, আমরা একত্রে আছি। কোচ চেষ্টা করে যাচ্ছেন, আমরাও তাকে সাহায্য করতে চাই।”
ক্লাবের ভেতর-বাহিরে খেলোয়াড়দের এই সমর্থনই আলোনসোর অবস্থানকে দৃঢ় করেছে। রিয়াল কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, অল্প কয়েকটি খারাপ ফলাফলের ভিত্তিতে তারা কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। ক্লাবের ওয়ার রুমে বরাবরই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ, আর বর্তমানে দলে যে আস্থার পরিবেশ আছে, তা পরিবর্তন করার কোনো কারণ তারা এখনই দেখছে না। ক্লাব কর্মকর্তাদের মতে, আলোনসো এখনো সেই মানুষ যাকে ঘিরে ভবিষ্যত পরিকল্পনা গড়ে তোলা যেতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রিয়ালের দুর্বল ফর্মের কারণ শুধু কোচের কৌশল নয়। দীর্ঘদিন ধরে দলে রয়েছে চোট সমস্যা, বেশ কিছু মূল খেলোয়াড় অনুপস্থিত বা ফর্মহীন। midfield-এ বোঝাপড়ার ঘাটতি, রক্ষণভাগে সমন্বয়ের সমস্যা, আক্রমণে ধার কমে যাওয়া—সব মিলেই তৈরি হয়েছে জটিলতা। এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সময় প্রয়োজন, এবং সেটিই এখন আলোনসো পাচ্ছেন দলের সমর্থনে।
তবে বিপদের ঝুঁকি একেবারে উড়িয়েও দেয়া যাচ্ছে না। ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং লা লিগা শিরোপার দৌড়ে থাকতে হলে দ্রুতই রিয়ালকে ফিরতে হবে জয় ধারায়। বিশেষ করে যেসব ম্যাচ সামনে আছে, সেগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও কঠিন হবে। যদি রিয়াল মাদ্রিদ বর্তমান দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়, বোর্ড তখন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
তবুও আপাতত ড্রেসিং রুমে শান্তির বাতাসই বইছে। আলোনসো এখনো আস্থা পাচ্ছেন, খেলোয়াড়রা তাকে সমর্থন করছেন এবং ক্লাবও জানাচ্ছে—তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তন নয়, বরং সমস্যা সমাধানই হবে অগ্রাধিকার।
রিয়ালের একতা, চেষ্টা এবং কোচকে ঘিরে দলের এই মনোভাবই হয়তো তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। এখন মাঠে শুধু প্রয়োজন ধারাবাহিকতা ও আত্মবিশ্বাস। ফুটবলের চিরাচরিত নিয়মই বলে—ফর্ম আসে, ফর্ম যায়; কিন্তু স্থিতিশীলতা ধরে রাখাই একটি বড় ক্লাবের শক্তি। আলোনসোর সামনে তাই এখন বড় সুযোগ—সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করা এবং রিয়ালকে আবারও সাফল্যের পথে ফেরানো।