প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বরে ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শুক্রবার দুপুরে রাজধানীতে সন্ত্রাসী হামলায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হঠাৎ করেই আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন। রাজপথে, টকশোতে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপসহীন বক্তব্যের জন্য পরিচিত এই তরুণ নেতাকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল নতুন নয়। তবে হামলার ঘটনার পর অনেকের মধ্যেই নতুন করে প্রশ্ন জেগেছে—কে এই ওসমান হাদি, কীভাবে তিনি এতটা সাহসী ও প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন, আর কোন পথ বেয়ে তিনি আজকের এই অবস্থানে পৌঁছালেন।
বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে হাদির জীবনের একটি সুস্পষ্ট ধারাবাহিকতা সামনে আসে। তার শৈশব, শিক্ষাজীবন, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতা মিলিয়েই গড়ে উঠেছে এই প্রতিবাদী চরিত্র।
শরিফ ওসমান হাদির গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলায়। দক্ষিণাঞ্চলের একটি সাধারণ শিক্ষিত পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। তার বাবা প্রয়াত মাওলানা আব্দুল হাদি ছিলেন একজন মাদ্রাসার শিক্ষক। ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতার পরিবেশেই হাদির শৈশব কেটেছে বলে জানিয়েছেন তার শিক্ষক ও স্থানীয়রা। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী এবং প্রশ্নপ্রবণ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। অন্যায় দেখলে চুপ করে না থাকার প্রবণতা ছিল শৈশব থেকেই।
হাদির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের শুরু নেছারাবাদ কামিল মাদ্রাসায়। এখানেই তিনি শিক্ষার পাশাপাশি বক্তৃতা ও বিতর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সহপাঠীদের কাছে তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী ও আত্মবিশ্বাসী একজন ছাত্র। শিক্ষকদের মতে, তিনি শুধু ভালো ছাত্রই ছিলেন না, বরং সামাজিক বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন। মাদ্রাসাজীবনে বিভিন্ন সামাজিক ও নৈতিক ইস্যুতে তার প্রশ্ন ও মন্তব্য অনেক সময় আলোচনার জন্ম দিত।
মাদ্রাসা শিক্ষা শেষ করে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হয়। এখানেই মূলত তার রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তার পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত পরিবেশ, ভিন্নমত ও বিতর্কের সংস্কৃতি তাকে আরও স্পষ্টভাষী করে তোলে। সহপাঠী ও বন্ধুদের ভাষ্যমতে, রাষ্ট্র, ক্ষমতা, বৈষম্য ও ন্যায়বিচার নিয়ে তার আগ্রহ ছিল গভীর। ক্লাসরুমের পাঠ্যবইয়ের বাইরেও তিনি দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও আন্দোলন নিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করতেন।
২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে হাদি প্রথম বড় পরিসরে পরিচিতি পান। সে সময় রাজপথে তার উপস্থিতি, সাহসী স্লোগান এবং সরাসরি বক্তব্য অনেক শিক্ষার্থী ও তরুণের মধ্যে অনুপ্রেরণা তৈরি করে। আন্দোলনের সময় বিভিন্ন টেলিভিশন টকশোতে অংশ নিয়ে তিনি নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। তার বক্তব্যে ছিল তীব্র সমালোচনা, কিন্তু একই সঙ্গে যুক্তি ও আত্মবিশ্বাস। অনেকেই তখন তাকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্ভাব্য মুখ হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর হাদির নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল সব ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ। বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, প্রতিবাদ কর্মসূচি ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে ইনকিলাব মঞ্চ দ্রুতই একটি পরিচিত নাম হয়ে ওঠে। অন্যায়, দুর্নীতি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে নিয়মিত বক্তব্য দিয়ে হাদি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন আপসহীন মুখপাত্র হিসেবে।
ইনকিলাব মঞ্চ শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এখানে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ, গান, কবিতা ও আলোচনা সভার মাধ্যমে ভিন্নধর্মী আন্দোলনের চর্চা দেখা যায়। এবারের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বাধীন প্যানেল থেকে ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিনিধি ফাতিমা তাসনিম জুমার নির্বাচিত হওয়া এই প্ল্যাটফর্মের প্রভাবকেই নির্দেশ করে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৫ সালের প্রেক্ষাপটে এসে হাদি আরও এক ধাপ এগিয়ে যান। তিনি ঘোষণা দেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে থাকবেন। এই সিদ্ধান্ত তার সমর্থকদের মধ্যে আশার সঞ্চার করলেও সমালোচকরাও ছিলেন সক্রিয়। প্রচারণার প্রস্তুতিকালেই তার ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে, যা দেশের রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
হাদির সাহসী হয়ে ওঠার পেছনের গল্প বলতে গিয়ে ঝালকাঠির এনএস কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা গাজী মুহাম্মদ শহিদুল ইসলাম স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, হাদি পঞ্চম শ্রেণি থেকে আলিম পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং সুবক্তা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে কখনো পিছপা হননি। শিক্ষক ও সহপাঠীদের সামনে স্পষ্টভাবে নিজের মত প্রকাশ করতেন, যা অনেক সময় সবাইকে চমকে দিত।
হাদির ঘনিষ্ঠজনদের মতে, তার সাহসের মূল উৎস ভয়কে অতিক্রম করার মানসিকতা। তিনি বিশ্বাস করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ থাকা নিজেই এক ধরনের অন্যায়। এই বিশ্বাসই তাকে রাজপথে নামিয়েছে, টকশোতে কঠোর ভাষায় কথা বলতে শিখিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী রাজনীতির দিকে নিয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক হামলার পর তার শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও নানা আলোচনা চলছে। সমর্থকরা বলছেন, এই হামলা তাকে আরও দৃঢ় করবে। সমালোচকরা আবার প্রশ্ন তুলছেন, এই ধরনের রাজনীতি কতটা নিরাপদ ও টেকসই। তবে নিরপেক্ষভাবে দেখলে বলা যায়, শরিফ ওসমান হাদি বাংলাদেশের তরুণ রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী চরিত্র, যার উত্থান যেমন দ্রুত, তেমনি বিতর্কও কম নয়।
সব মিলিয়ে হাদির জীবনের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তার সাহস কোনো হঠাৎ পাওয়া গুণ নয়। শৈশবের শিক্ষা, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এবং নিজের বিশ্বাস—এই সবকিছুর সম্মিলনেই তিনি আজকের এই অবস্থানে। সামনে তার পথ কোন দিকে মোড় নেবে, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত একটি বিষয় স্পষ্ট, শরিফ ওসমান হাদি তার সাহসী অবস্থানের কারণেই সমর্থন ও সমালোচনা—দুইয়েরই কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন।