প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শরীফ ওসমান হাদি—একটি নাম, একটি মুখ, আবার একই সঙ্গে একটি প্রতীক। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছেন ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং জুলাই বিপ্লবের সক্রিয় তরুণ সংগঠক হিসেবে। এমন একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে এক ধরনের নীরব শক নেমে আসে। এটি শুধু একজন ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে চলমান একটি গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি, যেখানে মতের ভিন্নতা আজও নিরাপত্তাহীন।
হাদির ওপর হামলার খবর মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে কেবল আবেগের জায়গা থেকে নয়, বরং আতঙ্ক, প্রশ্ন এবং আশঙ্কার জায়গা থেকেও। বহু মানুষ প্রশ্ন তুলছেন—বাংলাদেশে কি এখনও রাজনীতি মানেই সহিংসতা, বন্দুকের ভাষা এবং ভয় দেখানো? যদি তাই হয়, তবে তরুণ নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সহিংসতা নতুন কিছু নয়। তর্কের বদলে টার্গেট, বক্তব্যের বদলে বুলেট—এই বাস্তবতা বহুবার দেখা গেছে। কিন্তু হাদির ওপর হামলার ক্ষেত্রে বিশেষ একটি মাত্রা যুক্ত হয়েছে। তিনি কোনো প্রভাবশালী দলের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা নেতা নন। নিজের অবস্থান, যুক্তি এবং সাহসকে সম্বল করে উঠে আসা এক তরুণ কণ্ঠ। তরুণ রাজনীতির ওপর আঘাত মানে ভবিষ্যতের ওপর আঘাত, আর এই বার্তাটি নিঃসন্দেহে ভয়ংকর।
এই ঘটনার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দৃশ্য অনেক কিছু স্পষ্ট করে দিয়েছে। যাদের ‘উদাসীন’ বা ‘ফেসবুক প্রজন্ম’ বলে অবহেলা করা হতো, সেই তরুণরাই হাসপাতালে ছুটে গেছেন। তারা একজন আহত নেতার খোঁজ নিতে এসেছেন, তার পাশে দাঁড়াতে এসেছেন। এটি কেবল আবেগ নয়, এটি একটি সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তরুণ সমাজ আর নীরব দর্শক হয়ে থাকতে চায় না। তারা প্রশ্ন করে, যুক্তি শোনে এবং প্রতিবাদী কণ্ঠকে রক্ষা করতে চায়।
এই বাস্তবতা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে। তরুণরা এখন আর প্রান্তিক নয়; তারা ভবিষ্যতের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছে। তাদের উদ্বেগ, ক্ষোভ ও প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করলে রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরেই এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হবে, যার ফল ভালো হবে না।
হাদি দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের আধিপত্যবাদী ভূমিকা নিয়ে সরব ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিছিল থেকে শুরু করে বিভিন্ন আলোচনা ও অনলাইন বক্তব্যে তিনি তথ্য, দলিল ও যুক্তি তুলে ধরেছেন। অসম চুক্তি, সীমান্তে হত্যা, একতরফা সুবিধা—এসব প্রশ্ন তিনি প্রকাশ্যে তুলেছেন। এগুলো রাজনৈতিক বক্তব্য, যেগুলোর জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু রাজনীতির পরিসরে যুক্তির বদলে যদি সহিংসতার পথ বেছে নেওয়া হয়, তবে সেটি কেবল একটি ব্যক্তিকে নয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেই আঘাত করে।
আগস্টের অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা গিয়েছিল। বহু মানুষের মনে আশা জন্মেছিল যে প্রভাবনির্ভর রাজনীতির অবসান ঘটবে। কিন্তু হাদির মতো কণ্ঠগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে, পতন ঘটলেও প্রভাবের ছায়া পুরোপুরি সরে যায়নি। তিনি বারবার বলেছেন, স্বাধীনতা মানে কেবল মানচিত্র নয়; স্বাধীনতা মানে নীতিগত স্বাধীনতা, মর্যাদা ও সমান সম্পর্ক।
এই অবস্থান তাকে অনেকের কাছে অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে, কিন্তু সেটিই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক পথ। প্রশ্ন তোলা অপরাধ নয়। বরং প্রশ্নহীন সমাজই সবচেয়ে বিপজ্জনক। হাদির ওপর হামলা যদি সেই প্রশ্ন তোলার ফল হয়ে থাকে, তবে এটি আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করবে, আরও বিস্তৃত আলোচনার জন্ম দেবে।
ইনকিলাব মঞ্চের উত্থানও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা এই প্ল্যাটফর্মটি এখনো কোনো রাজনৈতিক দলে রূপ নেয়নি, তবে এটি একটি শক্তিশালী তরুণ সামাজিক শক্তি হিসেবে পরিচিত। তাদের বক্তব্য অনেক সময় তীক্ষ্ণ, কখনো কঠোর, কিন্তু প্রশ্নহীন নয়। হাদির ওপর হামলা তাই কেবল একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়; এটি একটি নতুন সামাজিক প্রতিরোধের ওপর আঘাত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এ ধরনের হামলা কখনো বিচ্ছিন্ন থাকে না। এটি একটি বার্তা দেয়—এবং যদি সেই বার্তা প্রতিহত না হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও টার্গেট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এখানেই রাষ্ট্র, প্রশাসন ও তদন্ত সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একজন সম্ভাব্য প্রার্থী গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত শুধু আইনি দায়িত্ব নয়; এটি রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্ন। সাধারণ মানুষ জানতে চায়—কারা হামলাকারী, উদ্দেশ্য কী, আগে কোনো হুমকি ছিল কি না, সিসিটিভি ফুটেজ আছে কি না এবং তদন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তর সময়মতো না এলে আস্থার সংকট আরও গভীর হবে।
এই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তরুণদের কাছে এর বার্তা। একদিকে এটি দেখায়, সত্য বললে শত্রু তৈরি হয়, সাহস দেখালে ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে তরুণদের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, এই প্রজন্ম ভয় পায় না। তারা নেতৃত্ব চায়, এবং সেই নেতৃত্বকে রক্ষা করতেও প্রস্তুত।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, শরীফ ওসমান হাদির ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নয়। এটি সময়ের প্রতিচ্ছবি, রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গভীর সমস্যার প্রকাশ। এখন প্রয়োজন দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, তরুণ নেতৃত্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান ঘটানোর বাস্তব উদ্যোগ।
হাদি হয়তো সুস্থ হয়ে ফিরবেন, আরও শক্ত হয়ে। কিন্তু তার ওপর হামলা যে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—আমরা কি বুলেটের রাজনীতি চাই, নাকি যুক্তির—তার উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক পথচলা।