প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিতে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর কেবল ভবিষ্যতের ধারণা নয়, বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা থেকে শুরু করে কনটেন্ট নির্মাণ—সব ক্ষেত্রেই এআই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। বিশেষ করে ভিডিও নির্মাণ ও সম্পাদনায় এআইয়ের ব্যবহার সাম্প্রতিক সময়ে বিপ্লব ঘটিয়েছে বলা যায়। তবে এই অগ্রগতির মাঝেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—এআই কি সত্যিই মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও গল্প বলার গভীরতা বুঝতে পারে?
প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এআই-নির্ভর ভিডিও এডিটিং টুলগুলো খুব দ্রুত ফুটেজ কাটছাঁট করতে পারে, রঙ ঠিক করতে পারে, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বসাতে পারে কিংবা নির্দিষ্ট টেমপ্লেট অনুযায়ী ভিডিও সাজিয়ে দিতে পারে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন ভিডিওতে আবেগ, মানবিক স্পর্শ বা গল্পের সূক্ষ্ম অনুভূতি প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রেই এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও দেখতে অতিরিক্ত যান্ত্রিক বা একঘেয়ে মনে হয়, যেন সবকিছু একই ছাঁচে ফেলা হয়েছে।
মানুষের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও গল্প বলার ক্ষমতা এখনো এমন একটি জায়গা, যেখানে এআই পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি। একটি ভিডিও শুধু দৃশ্যের সমষ্টি নয়; এটি নির্মাতার ভাবনা, দর্শকের অনুভূতি এবং সময়ের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একজন নির্মাতা যখন নিজের অভিজ্ঞতা, ব্যথা, আনন্দ কিংবা স্বপ্ন ভিডিওতে তুলে ধরেন, তখন সেটি দর্শকের হৃদয়ে আলাদা করে নাড়া দেয়। এই মানবিক সংযোগ তৈরি করাই হলো ভিডিওর প্রকৃত শক্তি, যা এখনো মানুষের হাতেই সবচেয়ে ভালোভাবে সম্ভব।
এআই মূলত তথ্য ও প্যাটার্নের ওপর কাজ করে। পূর্বের ডেটা বিশ্লেষণ করে সে অনুমান করতে পারে কোন দৃশ্যের পর কোন দৃশ্য বসালে ভিডিওটি আকর্ষণীয় হতে পারে। কিন্তু মানুষের আবেগ সব সময় প্যাটার্ন মেনে চলে না। কখনো নীরবতা, কখনো অপ্রত্যাশিত দৃশ্য বা অসম্পূর্ণতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে গল্পের গভীরতা। এই জায়গাগুলো বুঝতে হলে প্রয়োজন অনুভব করার ক্ষমতা, যা এখনো কেবল মানুষেরই রয়েছে।
তাই বলা যায়, এআই কখনোই পরিচালক হতে পারে না; সে হতে পারে একজন দক্ষ সহকারী। মৌলিকত্ব ধরে রাখতে হলে নির্মাতাকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ভিডিওটি কীভাবে আলাদা হবে, কোন জায়গায় থামবে, কোথায় গতি বাড়াবে, আর কোথায় আবেগকে কথা বলতে দেবে। এআই সময় বাঁচাতে পারে, কাজ সহজ করতে পারে, কিন্তু সৃজনশীল দিকনির্দেশনা মানুষের কাছ থেকেই আসতে হবে।
এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কপিরাইট ও লাইসেন্স। অনেক সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি গ্রাফিকস, মিউজিক বা ভিডিও ক্লিপ ব্যবহারে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই কনটেন্ট নির্মাতাদের এ বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। প্রযুক্তির সুবিধা নিতে গিয়ে যেন সৃজনশীলতার পাশাপাশি নৈতিকতা ও আইনি দায়িত্ববোধ হারিয়ে না যায়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
একসময় ভিডিও নির্মাণ মানেই ছিল দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা, রাত জেগে এডিট করা, বড় বাজেট ও জটিল সফটওয়্যারের ঝামেলা। সেই যুগ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন অনেক নির্মাতা কয়েক মিনিটেই একটি ভিডিও তৈরি করতে পারছেন। তবে এই সাফল্যের কৃতিত্ব শুধু প্রযুক্তির নয়; এর পেছনে রয়েছে নির্মাতার সৃজনশীল চিন্তা ও গল্প বলার দক্ষতা। প্রযুক্তি কেবল সেই ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে সাহায্য করছে।
এআই ভিডিও এডিটিং কনটেন্ট নির্মাণের জগৎকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছে। যারা আগে ভাবতেন ভিডিও বানানো কঠিন, সময়সাপেক্ষ কিংবা ব্যয়বহুল, এখন তারাও সহজেই শুরু করতে পারছেন। একটি আইডিয়া থাকলেই সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাকি কাজের বড় অংশ সামলাচ্ছে প্রযুক্তি। এর ফলে নতুন প্রজন্মের কনটেন্ট নির্মাতারা নিজেদের ভাবনা তুলে ধরার সাহস পাচ্ছেন, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে কল্পনা করা যায় এমন এক সময়, যখন মানুষ শুধু বলে দেবে—‘আমি যা বলতে চাই, সেটি ৩০ সেকেন্ডে একটি ভিডিও করে দাও’—আর এআই মুহূর্তেই সেটি তৈরি করে দেবে। সেই ভবিষ্যৎ খুব দূরে নয়। তবে যত প্রযুক্তি উন্নত হবে, মানুষের গল্প, আবেগ ও ব্যক্তিত্ব ততই মূল্যবান হয়ে উঠবে। কারণ প্রযুক্তি যত নিখুঁত হবে, ততই মানুষ খুঁজবে সেই মানবিক অসম্পূর্ণতা, যা অনুভূতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
শেষ পর্যন্ত সত্যিটা একটাই—এআই সাহায্য করবে, কাজ সহজ করবে, সময় বাঁচাবে। কিন্তু ভিডিওর প্রাণ, গল্পের হৃদস্পন্দন আর দর্শকের সঙ্গে মানসিক সংযোগ তৈরি করবে মানুষই। প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হোক না কেন, মানবিক আবেগের জায়গায় মানুষের বিকল্প এখনো নেই।