দূর মহাকাশে রহস্যময় ডার্ক স্টারের সন্ধানে জেমস ওয়েব

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১২ বার

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

ডার্ক স্টার আবিষ্কার নিয়ে সাম্প্রতিক এই গবেষণা জ্যোতির্বিজ্ঞানের জগতে নতুন আলো ফেলেছে এবং মহাবিশ্বের সূচনালগ্নের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে মহাকাশের গভীরতম অঞ্চল থেকে যে বিপুল তথ্য আসছে, তার বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা এবার দূর মহাকাশে তিনটি রহস্যময় ও অস্বাভাবিক বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন, যেগুলোকে ‘ডার্ক স্টার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

নামে ‘ডার্ক’ শব্দটি থাকলেও এই ডার্ক স্টারগুলো প্রকৃত অর্থে অন্ধকার নয়। সাধারণ তারার মতো এগুলোও আলো বিকিরণ করে, তবে সেই আলোর উৎস ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিজ্ঞানীদের মতে, এসব তারা নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে শক্তি উৎপন্ন করে না, বরং ডার্ক ম্যাটার নামক এক রহস্যময় উপাদানের মাধ্যমে শক্তি পেয়ে উজ্জ্বল হয়। এই ধারণা সত্য প্রমাণিত হলে মহাবিশ্বের প্রথম তারার জন্ম ও বিকাশ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বের মোট ভরের প্রায় ২৭ শতাংশ জুড়ে থাকলেও এটি সরাসরি দেখা যায় না। সাধারণ পদার্থের কণাগুলো বৈদ্যুতিক চার্জ বহন করে বলে আলো শোষণ বা প্রতিফলিত করতে পারে, কিন্তু ডার্ক ম্যাটারের কণাগুলো চার্জবিহীন হওয়ায় দৃশ্যমান নয়। তারা আলো শোষণ করে না, প্রতিফলন ঘটায় না এবং নিজেরাও আলো ছড়ায় না। তবু এর মহাকর্ষীয় প্রভাব দিয়ে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, ডার্ক ম্যাটার বাস্তবেই অস্তিত্বশীল এবং মহাবিশ্বের কাঠামো গঠনে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু তাত্ত্বিক মডেল অনুসারে, ডার্ক ম্যাটারের কণাগুলো নিজের প্রতিকণার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে পারে। এমন সংঘর্ষে কণা ও প্রতিকণা ধ্বংস হয়ে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়। যদি প্রাথমিক মহাবিশ্বে ঘন ডার্ক ম্যাটার অঞ্চলে এই ধরনের সংঘর্ষ ব্যাপকভাবে ঘটে থাকে, তবে সেখান থেকে নির্গত শক্তিই ডার্ক স্টারের মতো বস্তুর জন্ম দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সদ্য চিহ্নিত এই তিনটি বস্তুতে ডার্ক ম্যাটারের ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি।

দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, বিগ ব্যাংয়ের পরে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাসের বিশাল মেঘ মহাকর্ষের টানে ভেঙে পড়ে এবং তাপমাত্রা ও চাপ বেড়ে গিয়ে নিউক্লিয়ার ফিউশন শুরু হলে প্রথম তারার জন্ম হয়। কিন্তু ডার্ক স্টারের তত্ত্ব এই চিত্রকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে। ২০০৮ সালে প্রথম এই ধারণা উত্থাপিত হয় যে ডার্ক ম্যাটার হয়তো শুধু নীরব দর্শক ছিল না, বরং প্রাথমিক মহাবিশ্বে তারার জন্মে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ডার্ক ম্যাটার থেকে নির্গত শক্তি গ্যাস মেঘকে পুরোপুরি ধসে পড়তে বাধা দেয়। ফলে সেখানে নিউক্লিয়ার ফিউশন শুরু না হয়ে এক ভিন্ন ধরনের উজ্জ্বল বস্তু তৈরি হয়, যাকে ডার্ক স্টার বলা হয়। এসব তারা সাধারণ তারার তুলনায় অনেক বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এদের পৃষ্ঠের তাপমাত্রাও তুলনামূলকভাবে কম, যার ফলে এদের আলো ও বর্ণালিতে ভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

ডার্ক স্টারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এদের অত্যন্ত উচ্চ রেডশিফট। মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হওয়ায় দূরবর্তী বস্তুর আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ইনফ্রারেড তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সরে যায়। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ বিশেষভাবে ইনফ্রারেড আলো পর্যবেক্ষণে সক্ষম হওয়ায় এসব অতি দূরবর্তী ও প্রাচীন বস্তুকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। গবেষকদের মতে, যেসব বস্তু সম্প্রতি ধরা পড়েছে, সেগুলো সাধারণ প্রাথমিক তারা বা গ্যালাক্সির তুলনায় অনেক বেশি উজ্জ্বল এবং আকারেও বিশাল।

তবে ডার্ক স্টারের অস্তিত্ব নিয়ে এখনো বিজ্ঞানীদের মধ্যে পূর্ণ ঐকমত্য হয়নি। কেউ কেউ মনে করছেন, এগুলো হয়তো অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের গ্যালাক্সি বা অত্যন্ত বিশাল সাধারণ তারা, যেগুলো আশপাশের বিপুল পদার্থ আকর্ষণ করে তৈরি হয়েছে। আবার অন্য গবেষকদের মতে, ডার্ক ম্যাটার-নির্ভর শক্তির উপস্থিতি ছাড়া এদের উজ্জ্বলতা ও আকার ব্যাখ্যা করা কঠিন।

একটি ডার্ক স্টারের পরিণতি তার আকার ও ডার্ক ম্যাটারের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে। যদি ডার্ক ম্যাটার ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যায়, তবে ডার্ক স্টার সাধারণ নিউক্লিয়ার ফিউশনের পথে এগিয়ে গিয়ে একটি সাধারণ তারায় রূপ নিতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে এগুলো বিশাল ভরের কারণে সরাসরি ব্ল্যাক হোলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাও রাখে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই রহস্যের চূড়ান্ত সমাধানে আরও পর্যবেক্ষণ, উন্নত মডেল এবং ভবিষ্যতের শক্তিশালী টেলিস্কোপের সহায়তা প্রয়োজন। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ডার্ক স্টার আবিষ্কার আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে চিন্তাভাবনার দিগন্তকে আরও বিস্তৃত করেছে।

এই গবেষণা শুধু মহাকাশ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেই নয়, বরং মানব সভ্যতার জ্ঞানভান্ডারেও এক নতুন প্রশ্ন ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে—আমরা কি সত্যিই মহাবিশ্বের প্রথম আলোকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করেছি?

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত