কুয়াশা ও বিপজ্জনক বায়ুমানে নির্ধারিত সময়ের বদলে বিকেলে দিল্লি পৌঁছালেন মেসি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৩ বার

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

মেসির দিল্লি পৌঁছাতে বিলম্ব—এই ঘটনাই যেন তাঁর বহুল আলোচিত ‘গোট ইন্ডিয়া’ সফরের শেষ দিনের মূল প্রতিপাদ্য হয়ে উঠেছে। বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসি তিন দিনের ভারত সফরের শেষ দিনে সোমবার সকালে মুম্বাই থেকে দিল্লি পৌঁছানোর কথা থাকলেও ঘন কুয়াশা ও রাজধানীর বিপজ্জনক বায়ুমানের কারণে তা সম্ভব হয়নি। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে বিকেলে তিনি দিল্লিতে অবতরণ করেন, ফলে দিনের শুরুতে নির্ধারিত কয়েকটি আনুষ্ঠানিকতা পিছিয়ে যায়।

সোমবার সকাল থেকেই দিল্লির আকাশ ছিল ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন। দৃশ্যমানতা নেমে আসে অত্যন্ত কম পর্যায়ে, যার ফলে ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একের পর এক ফ্লাইট বিলম্বিত হয় বা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় আরও গুরুতর একটি বাস্তবতা—দিল্লির বায়ুমান সূচক। গত কয়েক দিন ধরেই রাজধানীর বাতাস ছিল ‘তীব্রতর’ দূষণের কবলে। সোমবার সকালে তা আরও অবনতি হয়ে ‘বিপজ্জনক’ স্তরে পৌঁছায়। স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিমান চলাচলসহ জনসমাগমপূর্ণ কার্যক্রমে সতর্কতা জারি থাকে।

এই প্রতিকূল আবহাওয়া ও পরিবেশগত বাস্তবতার সরাসরি প্রভাব পড়ে মেসির সফরসূচিতে। মুম্বাই থেকে সকালবেলা উড্ডয়ন করার কথা থাকলেও ফ্লাইট ছাড়তে দেরি হয়। শেষ পর্যন্ত বিকেল আড়াইটার দিকে মেসিকে বহনকারী বিমানটি দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে পৌঁছেই তাঁকে ঘিরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেখান থেকে সরাসরি তাঁর গন্তব্য ছিল ঐতিহাসিক অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম, যেখানে একাধিক আনুষ্ঠানিক ও জনসম্পৃক্ত ইভেন্টে অংশ নেওয়ার কথা ছিল তাঁর।

দিল্লিতে মেসির কর্মসূচি ছিল বেশ ঘনবসতিপূর্ণ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল এই সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। পাশাপাশি ফুটবল ও ক্রীড়াজগতের বিশিষ্টজনদের উপস্থিতিতে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার কথা ছিল তাঁর। এছাড়া তারকাদের অংশগ্রহণে একটি প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ এবং ভক্তদের সঙ্গে সাক্ষাতের মতো কয়েকটি আয়োজন ছিল সূচিতে। সকালের পরিবর্তে বিকেলে পৌঁছানোর কারণে আয়োজকদের সময়সূচিতে কিছুটা রদবদল আনতে হয়, তবে শেষ পর্যন্ত সব কর্মসূচি সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হয়।

ভারতে মেসির এই সফর শুরু হয়েছিল কলকাতা দিয়ে, আর সেই অধ্যায়টি ছিল নানা নাটকীয়তায় ভরা। সল্টলেকের যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মেসিকে এক নজর দেখার আশায় হাজার হাজার দর্শক ভিড় জমিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অতিরিক্ত উপস্থিতির কারণে সাধারণ দর্শকরা মাঠে ও গ্যালারিতে ঠিকমতো মেসিকে দেখতে পারেননি। মোটা অঙ্কের টিকিট কেটে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ একপর্যায়ে সহিংস রূপ নেয়। মাঠে ছোড়া হয় বোতল, ভাঙা হয় চেয়ার, এমনকি ফেন্সিং টপকে দর্শক মাঠে ঢুকে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করেও ব্যর্থ হয়। উত্তপ্ত পরিস্থিতির মুখে নির্ধারিত সময়ের আগেই মেসি স্টেডিয়াম ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে এই বিশৃঙ্খলার ঘটনায় মেসিকে ভারতে আনার অন্যতম উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত গ্রেপ্তার হন, যা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়।

কলকাতার সেই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার পর হায়দরাবাদে মেসির সফর ছিল তুলনামূলক শান্ত ও সুশৃঙ্খল। সেখানে আয়োজিত ইভেন্টগুলোতে কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। ভক্তদের সঙ্গে স্বাভাবিক পরিবেশে সময় কাটান তিনি, আয়োজকরাও প্রশংসা কুড়ান ব্যবস্থাপনার জন্য। এই সফল অধ্যায় শেষে মেসি যান মুম্বাইয়ে। ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত শহরটিতে তাঁর উপস্থিতি ঘিরে ছিল ভিন্নমাত্রার উন্মাদনা। এখানে তিনি সাক্ষাৎ করেন ক্রিকেট কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারের সঙ্গে, যা ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে ওঠে। ফুটবল ও ক্রিকেট—দুই ভিন্ন খেলার দুই মহাতারকার এই সাক্ষাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

মুম্বাইয়ে বিভিন্ন করপোরেট ও সামাজিক ইভেন্টে অংশ নেওয়ার পরই ছিল দিল্লি পর্ব। কিন্তু প্রকৃতি ও পরিবেশ যেন শেষ দিনে এসে সফরের গতি কিছুটা শ্লথ করে দেয়। দিল্লির বায়ুদূষণ ও কুয়াশার বিষয়টি শুধু মেসির সফরেই নয়, সামগ্রিকভাবেই ভারতের বিমান চলাচল ও জনজীবনে প্রভাব ফেলেছে। চিকিৎসক ও পরিবেশবিদরা বারবার সতর্ক করে আসছেন যে ‘বিপজ্জনক’ বায়ুমানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য। এমন প্রেক্ষাপটে একজন আন্তর্জাতিক তারকার সফরসূচি সামান্য বদলানোকে অনেকেই স্বাভাবিক হিসেবেই দেখছেন।

সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দিল্লিতে পৌঁছে নিজের নির্ধারিত দায়িত্ব পালনে ঘাটতি রাখেননি মেসি। সীমিত সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সফরের সমাপ্তি টানেন তিনি। ভারত সফরের শেষ প্রান্তে এসে কুয়াশা আর দূষণের কারণে সময়সূচি বদলালেও মেসির উপস্থিতি, তাঁর নাম ঘিরে তৈরি উন্মাদনা এবং নানা ঘটনার রেশ নিঃসন্দেহে দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে। বিশ্ব ফুটবলের এই মহাতারকার ভারত সফর শেষ হলেও স্মৃতি, বিতর্ক আর আবেগের রেশ রেখে গেল উপমহাদেশজুড়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত