যুদ্ধবিরতির আড়ালে গাজায় ইসরাইলের ‘হলুদ সীমারেখা’ ক্রমবিস্তার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৯ বার

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

ইসরাইলের হলুদ সীমারেখা প্রসার এখন গাজা উপত্যকার সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন এক আতঙ্কের নাম, যেখানে যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও বাস্তবতা প্রতিদিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

যুদ্ধবিরতির পর আহমদ হামিদ যখন গাজা শহরের শুজাইয়া মহল্লায় নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন, তখন তিনি ভেবেছিলেন দীর্ঘ দিনের অনিশ্চয়তা ও বাস্তুচ্যুতির পর হয়তো স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ মিলবে। যুদ্ধের সময় তাঁর বাড়ি ছিল বিপজ্জনক এলাকায়, ফলে পরিবার নিয়ে ফিরে আসা সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও তাঁরা প্রায় দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করেছিলেন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য। তখন ইসরাইল নিয়ন্ত্রিত এলাকার তথাকথিত ‘হলুদ সীমারেখা’ তাঁর বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে ছিল।

কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই দূরত্ব দ্রুত কমে আসে। আজ সেই হলুদ সীমারেখা তাঁর বাড়ি থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে। জানালা খুললেই চোখে পড়ে কংক্রিট ব্লক, সেনা অবস্থান এবং ধ্বংসস্তূপের দৃশ্য। ৩১ বছর বয়সী এই সাংবাদিক মিডল ইস্ট আইকে বলেন, যুদ্ধ শেষ হলেও তাঁর পরিবার যেন নতুন এক অঘোষিত যুদ্ধের ভেতরে আটকে পড়েছে।

হামিদের ভাষায়, ‘আমরা ভেবেছিলাম যুদ্ধবিরতির মানে অন্তত শান্তিতে ঘুমানো। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই বোমাবর্ষণ, বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া আর গুলির শব্দ শুনছি। সূর্যাস্ত হলেই শুরু হয়, ভোর পর্যন্ত থামে না।’ শুরুতে তাঁরা দূর থেকে বিস্ফোরণের শব্দ শুনে ভেবেছিলেন, হয়তো হলুদ সীমারেখা এখনও আগের জায়গাতেই আছে। কিন্তু এখন বাস্তবতা ভিন্ন।

গাজার ভেতরে এই হলুদ সীমারেখা মূলত একটি অস্থায়ী সামরিক সীমা, যা ইসরাইলি বাহিনী নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা চিহ্নিত করতে ব্যবহার করে। যুদ্ধবিরতির পর গত অক্টোবরে ইসরাইল ঘোষণা দিয়েছিল, তারা সেনা প্রত্যাহার করে এই সীমারেখার ভেতরে অবস্থান নেবে এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু এলাকা পারাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকবে। সেই সময় পুরো গাজাকে উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব দিক থেকে এই সীমারেখা দিয়ে কার্যত ঘিরে ফেলা হয়।

কিন্তু যুদ্ধবিরতির পরপরই এই সীমারেখা ক্রমশ পশ্চিম দিকে, অর্থাৎ ফিলিস্তিনিদের বসবাসরত এলাকার ভেতরে এগোতে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গাজার প্রায় ৫৩ শতাংশ ভূখণ্ড ইসরাইলের কার্যকর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এর ফলে হাজার হাজার পরিবার আবারও তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে।

এই নীরব বাস্তুচ্যুতি সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে ফিরে আসা মানুষদের। যুদ্ধের সময় যারা সর্বস্ব হারিয়েছিল, যুদ্ধবিরতির পর যারা ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেও টিকে থাকা বাড়িতে ফিরে এসেছিল, তারা এখন আবার অনিশ্চয়তার মুখে। হামিদ বলেন, ‘যুদ্ধের সময় মানুষ আমাদের কষ্টের কথা বলত। মনে হতো কেউ আমাদের দেখছে। এখন সবাই চুপ। পরিবারগুলো নীরবে এলাকা ছেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ তা খবরে আনছে না।’

এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির অর্থ নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। কারণ যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরাইলি বাহিনীর হামলা থামেনি। গাজা শহরে সাম্প্রতিক এক হামলায় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জুদ্দীন আল-কাসসাম ব্রিগেডের জ্যেষ্ঠ কমান্ডার রায়েদ সাদ নিহত হন। হামাসের নেতা খলিল আল-হাইয়া এক ভিডিও বার্তায় এই ঘটনার তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, এটি যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং ৪৫ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গত দুই বছরের আগ্রাসন এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির সময় মিলিয়ে গাজায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭০ হাজার ৬৬৩ জনে এবং আহত হয়েছেন এক লাখ ৭১ হাজার ১৩৯ জন।

বিশ্লেষকদের মতে, হলুদ সীমারেখা প্রসারের মাধ্যমে ইসরাইল কার্যত গাজার ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলে দিচ্ছে। যুদ্ধবিরতির আড়ালে ধীরে ধীরে এলাকা দখল, সামরিক স্থাপনা বিস্তার এবং বসতবাড়ির ওপর চাপ সৃষ্টি করে ফিলিস্তিনিদের বাধ্য করা হচ্ছে এলাকা ছাড়তে। এই কৌশলকে অনেকেই ‘নীরব দখল’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, এভাবে সীমারেখা পরিবর্তন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল। যুদ্ধবিরতির সময় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার ছিল, বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। বরং ফিলিস্তিনিদের জন্য জীবন আরও সংকুচিত হয়ে আসছে।

গাজার বাসিন্দাদের কাছে হলুদ সীমারেখা এখন শুধু একটি সামরিক চিহ্ন নয়; এটি তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার প্রতীক। যে ঘরগুলো যুদ্ধের আগ্রাসন টিকে গিয়েছিল, সেগুলো এখন যুদ্ধবিরতির মাঝেই হারানোর শঙ্কায়। হামিদের কণ্ঠে সেই হতাশাই প্রতিফলিত হয়, ‘দুই বছর আগ্রাসনের পরও যখন বাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল, তখন আল্লাহর শোকর করেছি। আর এখন যুদ্ধবিরতির মধ্যে আমরা সব হারাতে বসেছি।’

গাজার আকাশে হয়তো যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর কিছুটা নীরবতা নেমেছিল, কিন্তু মাটিতে বাস্তবতা ভিন্ন। হলুদ সীমারেখা যত এগোচ্ছে, ততই সংকুচিত হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের জীবন, স্বপ্ন আর নিরাপত্তা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত