প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার রামপুর গ্রামে আনন্দ আর গর্বের মাতম চলছে। গ্রামেরই মাখনুন আক্তার ও মুসফিকা নাজনিন নামের যমজ দুই বোন একসঙ্গে মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পাওয়ায় পরিবারসহ পুরো গ্রামে উৎসবের আবহ সৃষ্টি হয়েছে। এই কৃতিত্ব কেবল তাদের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং গ্রামীণ সমাজে মেয়েদের শিক্ষায় অগ্রযাত্রার অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় মাখনুন আক্তার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন, যেখানে তিনি রোল নম্বর ২০০২০৮০ নিয়ে ৮২.৫ নম্বর অর্জন করেন। তার যমজ বোন মুসফিকা নাজনিন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন, রোল নম্বর ২০০১৮৩৫ এবং ৮০.৫ নম্বর অর্জনের মাধ্যমে। তারা দুজনই একই কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন।
৩ মার্চ ২০০৭ সালে জন্ম নেওয়া যমজ দুই বোন শৈশবকাল থেকেই পড়াশোনায় সমান আগ্রহী ছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে, পরে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা সম্পন্ন করেন সেতাবগঞ্জ সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় ও দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে। উভয়েই উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
তাদের পিতা মশিউর রহমান মুরারিপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত। তিন কন্যার জনক হলেও তিনি কখনো মেয়েসন্তান হওয়াকে সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখেননি। তিনি বলেন, “আমার তিনটি মেয়ে—কোনো ছেলে নেই। কিন্তু আমি কখনো আক্ষেপ করিনি। আমি বিশ্বাস করি, সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে—শিক্ষাই আসল পরিচয়। আল্লাহ তা’আলা আমাদের মেয়ে দুজনকে মেডিকেলে সুযোগ দিয়েছেন। তারা যেন ভালো ডাক্তার হয়ে দেশের মানুষের সেবা করতে পারে, এটাই আমার দোয়া।”
মাখনুন আক্তার বলেন, “প্রথমেই আল্লাহর শুকরিয়া। মা-বাবার সহযোগিতা ছাড়া এই সাফল্য সম্ভব হতো না। ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হওয়ার, আর বাবারও ইচ্ছা ছিল আমি যেন দেশের মানুষের সেবা করতে পারি। ভবিষ্যতে আমি আমাদের গ্রামের মানুষের সেবা করতে চাই।”
তার যমজ বোন মুসফিকা নাজনিন বলেন, “আমরা একসঙ্গে মেডিকেলে চান্স পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত। ভবিষ্যতে একজন ভালো ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করতে চাই।” তাদের বড় বোন মাইমুনা আক্তার মিমও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “আমার ছোট দুই বোন মেডিকেলে চান্স পেয়েছে—এটা আমাদের পরিবারের জন্য অনেক বড় আনন্দের বিষয়। আল্লাহর কাছে দোয়া করি তারা দেশ ও সমাজের জন্য কিছু করতে পারে।”
স্থানীয় সমাজসেবক আব্দুল বাতেন বলেন, “গ্রামবাসী এই সাফল্যে গর্বিত। আশা করি তারা আরও বড় সফলতা অর্জন করবে।” রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রোখসানা বেগমও জানিয়েছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তারা খুব নিয়মিত ও মনোযোগী ছিল। তাদের পাঁচ বছরের প্রাথমিক শিক্ষাজীবনে অনুপস্থিতির রেকর্ড নেই। তখনই তিনি বলতেন, তারা একদিন বড় কিছু করবে।
এই যমজ দুই বোনের কৃতিত্ব কেবল পারিবারিক আনন্দের উৎস নয়, বরং গ্রামীণ সমাজে মেয়েদের শিক্ষার গুরুত্বকে তুলে ধরেছে। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে তারা গ্রাম ও দেশের জন্য গৌরবের উদাহরণ স্থাপন করেছেন। মাখনুন আক্তার ও মুসফিকা নাজনিনের এই সাফল্য প্রমাণ করে, কঠোর পরিশ্রম, পরিবারের সমর্থন এবং স্বপ্নের প্রতি অঙ্গীকার থাকলেই যে কোনো সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা সম্ভব।