ফিফার দ্য বেস্ট সিংহাসনে উসমান দেম্বেলে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৭ বার
ফিফার দ্য বেস্ট জিতে উসমান দেম্বেলের ঐতিহাসিক সাফল্য

প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব ফুটবলের ব্যক্তিগত স্বীকৃতির মুকুটে ২০২৫ সালটি পুরোপুরি নিজের করে নিলেন উসমান দেম্বেলে। ব্যালন ডি’অর জয়ের পর এবার ফিফার সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মান ‘দ্য বেস্ট ফিফা মেন’স প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারও উঠেছে তাঁর হাতে। কিলিয়ান এমবাপে ও লামিনে ইয়ামালের মতো দুই প্রজন্মের দুই সুপারস্টারকে পেছনে ফেলে এই অর্জন দেম্বেলেকে নিয়ে গেছে ক্যারিয়ারের নতুন এক উচ্চতায়। ফরাসি এই তারকার জন্য ২০২৫ সাল শুধু ট্রফির বছর নয়, বরং নিজেকে বিশ্ব ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক সময়।

প্যারিস সেন্ট জার্মেইনের হয়ে দেম্বেলের মৌসুমটি শুরু থেকেই ছিল ব্যতিক্রমী। দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাবনাময় প্রতিভা হিসেবে পরিচিত থাকলেও ইনজুরি ও ধারাবাহিকতার অভাবে প্রশ্ন ছিল তাঁর সামর্থ্য নিয়ে। কিন্তু চলতি মৌসুমে সেই সব প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন মাঠেই। পিএসজির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ে দেম্বেলের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে গোল, অ্যাসিস্ট এবং আক্রমণভাগে তাঁর গতি ও সৃজনশীলতা দলকে এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। ক্লাবের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণে মুখ্য ভূমিকায় থাকা এই ফরাসি উইঙ্গার তাই মৌসুম শেষে স্বীকৃতির আলোয় উঠে আসবেন, সেটাই ছিল প্রত্যাশিত।

চ্যাম্পিয়নস লিগের পাশাপাশি পিএসজির ঘরোয়া মৌসুমেও দেম্বেলের প্রভাব ছিল গভীর। লিগ ওয়ান, ফরাসি কাপ ও সুপার কাপ—ঘরোয়া ট্রেবল জয়ের পথে একের পর এক ম্যাচে ম্যাচসেরা পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন তিনি। আক্রমণভাগে তাঁর উপস্থিতি প্রতিপক্ষ রক্ষণকে সবসময় ব্যস্ত রেখেছে, খুলে দিয়েছে অন্য ফরোয়ার্ডদের জন্য জায়গা। শুধু গোলসংখ্যা দিয়েই নয়, বরং দলের সামগ্রিক খেলায় তাঁর প্রভাবই তাঁকে আলাদা করেছে অন্যদের থেকে।

২০২৫ সালে পিএসজি প্রথমবারের মতো ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছায়, আর সেখানেও দেম্বেলের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্বের অন্যান্য মহাদেশের সেরা ক্লাবগুলোর বিপক্ষে লড়াইয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস পিএসজিকে এনে দেয় বাড়তি শক্তি। এই টুর্নামেন্টে তাঁর পারফরম্যান্স ফিফার ভোটারদের চোখে দেম্বেলেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দেয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ফিফা দ্য বেস্ট পুরস্কারের ভোটিং প্রক্রিয়ায় জাতীয় দলের কোচ, অধিনায়ক, সাংবাদিক ও সমর্থকদের ভোট বিবেচনায় নেওয়া হয়। সেখানে দেম্বেলে পেয়েছেন সর্বাধিক সমর্থন। তাঁর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, বড় ম্যাচে প্রভাব এবং দলকে শিরোপা জেতানোর ভূমিকা—সব মিলিয়ে তাঁকে বছরের সেরা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। কিলিয়ান এমবাপে ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানে উজ্জ্বল থাকলেও দলীয় সাফল্যের দিক থেকে পিছিয়ে পড়েন। তরুণ লামিনে ইয়ামাল নিজের প্রতিভার ঝলক দেখালেও অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিকতার বিচারে দেম্বেলের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেননি।

পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের ফুটবলেও আধিপত্য বজায় রেখেছেন আইতানা বোনমাতি। ব্যালন ডি’অরের পর ২০২৫ সালে ফিফা দ্য বেস্ট নারী খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জিতেছেন এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার। টানা তৃতীয়বারের মতো এই সম্মাননা অর্জন করে তিনি নিজেকে সময়ের অন্যতম সেরা নারী ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বার্সেলোনার হয়ে ক্লাব পর্যায়ে এবং স্পেন জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর নিয়ন্ত্রণ, পাসিং ও ম্যাচ রিডিং প্রশংসিত হয়েছে বিশ্বজুড়ে।

কোচিং বিভাগেও ছিল পরিচিত মুখের আধিপত্য। নারী ফুটবলে বর্ষসেরা কোচ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ইংল্যান্ড নারী দলের কোচ সারিনা ভিগমান। ইউরোপ ও বিশ্ব মঞ্চে ইংল্যান্ডের ধারাবাহিক সাফল্যের নেপথ্যে তাঁর কৌশল ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবেই এই পুরস্কার। অন্যদিকে পুরুষদের বর্ষসেরা কোচের সম্মান জিতেছেন পিএসজি কোচ লুইস এনরিকে। চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় এবং দলকে একটি সুসংগঠিত ইউনিটে রূপ দেওয়ার কৃতিত্ব তাঁকে এনে দিয়েছে এই স্বীকৃতি।

ফিফা দ্য বেস্ট অ্যাওয়ার্ডসের মানবিক দিকটি উঠে এসেছে ফেয়ার প্লে অ্যাওয়ার্ডের মাধ্যমে। এই বছর পুরস্কারটি পেয়েছেন জার্মান ক্লাব এসএসভি ইয়ান রেগেন্সবুর্গের চিকিৎসক ডা. আন্দ্রেয়াস হারলাস-নয়কিং। গত এপ্রিল মাসে ২. বুন্দেসলিগার একটি ম্যাচ চলাকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া এক দর্শকের জীবন বাঁচাতে মাঠে ছুটে যান তিনি। দ্রুত চিকিৎসা দিয়ে দর্শককে স্থিতিশীল করেন এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। একজন চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের স্বীকৃতি হিসেবেই ফিফা তাঁকে এই সম্মানে ভূষিত করেছে।

বছরের সেরা গোলের জন্য পুসকাস অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন সান্তিয়াগো মঁতিয়েল। মে মাসে ইন্ডিপেনদিয়েন্তের জার্সিতে বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া তাঁর অবিশ্বাস্য ওভারহেড কিক ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সাহসী সিদ্ধান্ত এবং নিখুঁত বাস্তবায়নের সমন্বয়ে সেই গোলটি বছরের সেরা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।

গোলকিপিং বিভাগেও ছিল আলোচিত নাম। ফিফার দ্য বেস্ট গোলকিপার অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন ইংল্যান্ড নারী দলের হানা হ্যাম্পটন এবং পুরুষ বিভাগে ম্যানচেস্টার সিটি ও ইতালির জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মা। হ্যাম্পটনের ধারাবাহিক সেভ ও বড় ম্যাচে নির্ভরযোগ্য পারফরম্যান্স তাঁকে এনে দিয়েছে এই সম্মান। দোন্নারুম্মা পিএসজির হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে একাধিক ম্যাচ বাঁচানো সেভ দিয়ে প্রমাণ করেছেন কেন তিনি বিশ্বের সেরা গোলরক্ষকদের একজন।

সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের ফিফা দ্য বেস্ট অ্যাওয়ার্ডস ফুটবলের নানা দিককে এক মঞ্চে তুলে ধরেছে—তারকাখ্যাতি, দলীয় সাফল্য, কোচিং কৌশল, মানবিকতা এবং নান্দনিক গোল। তবে এই আয়োজনের কেন্দ্রে ছিলেন উসমান দেম্বেলে। এক সময় যাঁকে ঘিরে ছিল অনিশ্চয়তা, সেই দেম্বেলেই আজ ব্যালন ডি’অর ও ফিফা দ্য বেস্ট—দুটি সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্বীকৃতি নিজের করে নিয়ে লিখলেন অনন্য এক গল্প। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে ২০২৫ সাল তাই স্মরণীয় হয়ে থাকবে দেম্বেলের সাফল্যের বছর হিসেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত