সুদানে মানবিক বিপর্যয়: আরেকটি গাজা তৈরির অভিযোগ ব্রিটেনের দিকে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫২ বার
সুদানে যুদ্ধ ও ব্রিটেনের ভূমিকা

প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফ্রিকার উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত সুদান আজ এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের নাম। সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ নেই। বরং আন্তর্জাতিক শক্তির পরোক্ষ হস্তক্ষেপ, অস্ত্র সরবরাহ ও কূটনৈতিক নীরবতার কারণে এই যুদ্ধ দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। পর্যবেক্ষক গোষ্ঠী ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, সুদানে যা ঘটছে তা অনেকাংশেই গাজার সঙ্গে তুলনীয়—নির্বিচার হত্যা, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জনপদ, গণবাস্তুচ্যুতি এবং বিশ্ব শক্তিগুলোর বিতর্কিত ভূমিকা।

এই সংঘাতের শিকড় সুদানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীরভাবে প্রোথিত। দুই দশক আগে দারফুর অঞ্চলে সংঘটিত গণহত্যা ও জাতিগত সহিংসতার স্মৃতি আজও দেশটির মানুষকে তাড়া করে ফেরে। সেই সময় দারফুরের জনগণকে রক্ষায় যে বিদ্রোহী নেতারা অস্ত্র ধরেছিলেন, তাঁদের একজন ছিলেন মিন্নি মিন্নাভি। তখন তাঁর প্রধান শত্রু ছিল সুদান সরকারের মদদপুষ্ট জানজাবিদ মিলিশিয়া। সময়ের ব্যবধানে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে, কিন্তু সহিংসতার চরিত্র বদলায়নি। সম্প্রতি সুদান সফরে পোর্ট সুদানে আবার মিন্নাভির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। আজ তিনি বিদ্রোহী নন, বরং দারফুরের গভর্নর হিসেবে সরকারের পক্ষে কাজ করছেন। তবু তাঁর শত্রু সেই একই শক্তি—জানজাবিদ থেকে রূপান্তরিত আরএসএফ।

দারফুর সংঘাত স্তিমিত হওয়ার পর ২০১৩ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির জানজাবিদ যোদ্ধাদের নিয়ে র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস গঠন করেন। উদ্দেশ্য ছিল এই আধাসামরিক বাহিনীকে রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করা। ২০১৭ সালে পার্লামেন্ট আরএসএফকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত করার খসড়া আইনও পাস করে। কিন্তু এই সম্পর্ক কখনোই স্থিতিশীল হয়নি। ২০১৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের মুখে আল-বশির ক্ষমতাচ্যুত হলে সামরিক ও বেসামরিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নতুন সরকার গঠিত হয়। সেই সরকারও টেকেনি। ২০২১ সালে সেনাবাহিনী ও আরএসএফ যৌথভাবে ক্ষমতা দখল করে, যার নেতৃত্বে ছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং আরএসএফ প্রধান মোহাম্মদ হামদান দাগাল, যিনি হেমেদতি নামে পরিচিত।

ক্ষমতার এই জোট দ্রুতই ভেঙে পড়ে। আরএসএফকে সেনাবাহিনীতে একীভূত করার প্রশ্নে আল-বুরহান ও হেমেদতির মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র হয় এবং ২০২৩ সালের এপ্রিলে তা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়। কয়েক মাস পর আল-বুরহান আরএসএফ ভেঙে দেওয়ার ডিক্রি জারি করলেও ততদিনে বাহিনীটি একটি শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অস্ত্র সহায়তা পাচ্ছে, যার পেছনে যুক্তরাজ্যসহ প্রভাবশালী পশ্চিমা শক্তির ভূমিকা রয়েছে।

এই সংঘাত এখন কার্যত একটি প্রক্সি যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত দেড় লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় এক কোটি বিশ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। জাতিসংঘ সুদানকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আরএসএফের বিরুদ্ধে গণহত্যা, অপহরণ, গণধর্ষণ, যৌন দাসত্ব, নির্যাতন এবং জাতিগত নির্মূল অভিযানের অভিযোগ রয়েছে। ভয়াবহ বিষয় হলো, এসব বর্বরতার অনেক দৃশ্য তারা নিজেরাই ধারণ করে অনলাইনে ছড়িয়ে দিয়েছে। রাজধানী খার্তুমের জাতীয় জাদুঘর লুটপাট ও ধ্বংস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিশ্চিহ্ন করার ঘটনাগুলো এই সহিংসতার নগ্ন প্রমাণ।

আরএসএফ যোদ্ধারা জাতিগত ও উপজাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে টার্গেট করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের দখলকৃত এলাকাগুলোতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। ফলে রাজধানী খার্তুম দখলের পর হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক শহর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। পশ্চিম সুদানের উত্তর দারফুরের রাজধানী এল-ফাশারে সাম্প্রতিক হামলায় হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশ্রয়শিবিরে নির্বিচার আক্রমণ চালিয়ে শত শত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এল-ফাশার কার্যত একটি রক্তাক্ত জনপদে পরিণত হয়েছে।

সুদানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেও নগর এলাকায় নির্বিচার বিমান হামলার অভিযোগ রয়েছে, তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, আরএসএফের সহিংসতা ও বর্বরতা তার চেয়েও বহুগুণ ভয়াবহ। সুদানি সেনাবাহিনীর উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াসের আল-আত্তা সম্প্রতি আরএসএফকে চেঙ্গিস খানের মোগল বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করেছেন, যারা মধ্যযুগে এশিয়া জুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তাঁর মতে, এই তুলনা সুদানে চলমান ধ্বংসযজ্ঞের প্রকৃতি বোঝাতে যথাযথ।

এই যুদ্ধের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উঠে আসছে স্বর্ণ, তেলসহ সুদানের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। আত্তার ভাষায়, বেসামরিক মানুষের জীবনের কোনো মূল্য এখানে নেই। তিনি আরএসএফকে ‘আমিরাতের স্বার্থ হাসিলের একটি হাতিয়ার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এই নীরবতা সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থের জোরে কেনা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সুদানের সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি যুক্তরাজ্যের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। অভিযোগ রয়েছে, ব্রিটেন আরব আমিরাতের কাছে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রেখেছে, যা শেষ পর্যন্ত আরএসএফের হাতে গিয়ে সুদানে গণহত্যায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

২০২৪ সালের জুনে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে জানায়, যুক্তরাজ্যের সরকারি কর্মকর্তারা আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ব্রিটিশ সামরিক সরঞ্জাম আরএসএফের হাতে পৌঁছানোর যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। ক্যাম্পেইন অ্যাগেইনস্ট আর্মস ট্রেড জানিয়েছে, ব্রিটেন জানত যে আরব আমিরাত আরএসএফকে সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে, তবুও অস্ত্র বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি আরএসএফের ব্যবহৃত সাঁজোয়া যানগুলোতে যুক্তরাজ্যে তৈরি ইঞ্জিন পাওয়া গেছে।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সুদান প্রসঙ্গে বিতর্কে দেখা গেছে, মন্ত্রীরা বারবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম এড়িয়ে গেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাজ্যের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার হলো আরব আমিরাত। ব্রিটেনে তাদের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে এবং জনপ্রিয় ফুটবল ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির মালিকানার সঙ্গেও আমিরাতের রাজপরিবার জড়িত।

সুদানে চলমান সহিংসতার প্রমাণ যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে একটি ভয়ংকর বাস্তবতা—আন্তর্জাতিক শক্তির নীরবতা ও পরোক্ষ সমর্থনে একটি গোটা দেশ ধ্বংসের পথে। বেসামরিক নাগরিক, শিশু, নারী এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই যুদ্ধের প্রধান শিকার। অনেক বিশ্লেষকের মতে, যদি এখনই কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ ও মানবিক উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে সুদান খুব শিগগিরই আরেকটি গাজায় পরিণত হবে—যেখানে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়বে একটি জাতির ভবিষ্যৎ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত