নির্বাচনের আগে শ্রমিক অসন্তোষ: সমাধানের পথে এডিআর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৬ বার
নির্বাচন-পূর্ব শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনের উপায়

প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, রাজনৈতিক অঙ্গনের উত্তাপ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতেও। আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পঘন এলাকায় নির্বাচন-পূর্ব সময় মানেই এক ধরনের অদৃশ্য চাপ, যা শ্রমিকদের মনোভাব, ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত এবং সামগ্রিক উৎপাদন পরিবেশকে প্রভাবিত করে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ, আর্থিক চাপ এবং প্রত্যাশা—সবকিছু মিলিয়ে এই সময়টিতে শ্রমিক অসন্তোষ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাস্তব ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নির্বাচনী বছরগুলোতে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বেতন-বোনাস সংক্রান্ত বিরোধ, কর্মপরিবেশ নিয়ে ক্ষোভ, হঠাৎ ছড়ানো গুজব কিংবা বাইরের উসকানি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বড় অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। সবচেয়ে বড় কথা, বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাও নড়বড়ে হয়ে যায়। তাই নির্বাচন-পূর্ব সময়ে শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীলতা রক্ষা করা কেবল শ্রমিক বা মালিকপক্ষের বিষয় নয়; এটি একটি জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন।

বাংলাদেশের শ্রমবাজার বাস্তবতা কেবল অর্থনীতির সূত্রে আবদ্ধ নয়, বরং রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। নির্বাচন সামনে এলে অবরোধ, পরিবহন সংকট কিংবা সহিংসতার আশঙ্কায় শ্রমিকদের কর্মস্থলে যাতায়াত ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে কাজের সময় কমে যায়, আয় ব্যাহত হয়। একই সময়ে শ্রমিক সংগঠনগুলোর তৎপরতাও বাড়ে। দাবি-দাওয়া জোরালো হয়, আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়া হয় এবং কখনো কখনো রাজনৈতিক স্বার্থও শ্রমিক অসন্তোষকে উসকে দেয়। শ্রমিকদের একটি অংশ মনে করে, নির্বাচনের বছরে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো শ্রমিকবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে, ফলে প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে হতাশা দ্রুত অসন্তোষে রূপ নেয়।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

এই প্রেক্ষাপটে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ইউটিউবে ছড়ানো অযাচিত গুজব বা ভুল তথ্য শিল্পাঞ্চলে মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। কোনো একটি কারখানায় সমস্যা হলে তা বাড়িয়ে অন্য কারখানার শ্রমিকদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে। নির্বাচন-পূর্ব সময়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপ থাকায় অনেক সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেরি হয়। ফলে ছোট একটি ভুল বোঝাবুঝিও বড় সংঘাতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

এই বাস্তবতায় শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে প্রচলিত দমনমূলক বা শাস্তিমূলক পন্থা কার্যকর ও টেকসই সমাধান দিতে পারে না। বরং প্রয়োজন দ্রুত, মানবিক ও আস্থাভিত্তিক এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে বিরোধের শুরুতেই সংলাপ ও সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়। এই জায়গাতেই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এবং পরবর্তী সংশোধনীগুলোতে এডিআরের ধারণা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের সংস্কারে যুক্ত এডিআর-সংক্রান্ত ধারাগুলো এই প্রক্রিয়াকে আরও স্পষ্ট, কাঠামোবদ্ধ ও কার্যকর করেছে। আদালতে দীর্ঘ মামলা-মোকদ্দমার পরিবর্তে আলোচনা, মধ্যস্থতা ও সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে এডিআর প্রয়োগ করে শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমাধানের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত দেখা গেছে।

নির্বাচনী সময়ের মতো সংবেদনশীল পর্বে এডিআরের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায়। কারণ এই সময়টিতে সামান্য ভুল বোঝাবুঝিও বড় রাজনৈতিক বা সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। এডিআর বিরোধের প্রাথমিক পর্যায়েই শ্রমিক ও মালিকপক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসায়। এতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আগেই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আসে, উৎপাদন ব্যাহত হয় না এবং শিল্পাঞ্চলে শান্তি বজায় রাখা সহজ হয়।

এডিআর কোনো জয়ের বা পরাজয়ের প্রতিযোগিতা নয়। এটি একটি মানবিক প্রক্রিয়া, যেখানে উভয় পক্ষের স্বার্থ ও সম্মানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আদালতের কঠোর আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই এখানে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে সমাধান খোঁজা হয়। ফলে শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভবিষ্যতের জন্য বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে বাস্তবে এডিআর প্রয়োগে এখনো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দক্ষ মধ্যস্থতাকারীর অভাব, অনেক কারখানায় এইচআর ও ওয়েলফেয়ার কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকা, শ্রমিকদের আইনি সচেতনতার ঘাটতি এবং পারস্পরিক আস্থার সংকট এডিআরের কার্যকারিতা সীমিত করে। নির্বাচন-পূর্ব সময়ে এই সীমাবদ্ধতাগুলো আরও প্রকট হয়ে ওঠে, কারণ তখন চাপ ও উত্তেজনা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে।

এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনকালীন সময় এডিআর কার্যকর করতে হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সংগঠিত ও প্রস্তুত হতে হবে। প্রতিটি কারখানায় ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অভ্যন্তরীণ এডিআর কাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি। এইচআর ও ওয়েলফেয়ার কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিরোধের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বেতন-বোনাসসংক্রান্ত বিষয়গুলো আগেভাগেই সমাধান করা গেলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের অসন্তোষ এড়ানো সম্ভব।

একই সঙ্গে শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও আস্থাভিত্তিক আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। ত্রিপক্ষীয় বৈঠক, সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং এবং শিল্পপুলিশ, প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়ক হতে পারে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হওয়া উচিত শাস্তি নয়, বরং সমস্যা সমাধান ও আস্থা পুনর্গঠন।

এ ছাড়া শ্রম আইন সংশোধনীতে যুক্ত ৩৪৮(গ) ধারার আওতায় প্রস্তাবিত বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কর্তৃপক্ষ দ্রুত গঠন ও কার্যকর করা প্রয়োজন। এই কর্তৃপক্ষ নীতিমালা প্রণয়ন, প্রশিক্ষণ ও মান নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখতে পারে। শ্রম আদালতের মামলাগুলোতে এডিআরকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে আদালতের ওপর চাপ কমবে এবং শ্রমিক-মালিক উভয় পক্ষ দ্রুত সমাধান পাবে।

সব মিলিয়ে, নির্বাচন-পূর্ব শ্রমিক অসন্তোষ কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সম্মিলিত প্রতিফলন। এই বাস্তবতায় দমন নয়, বরং সংলাপ ও সমঝোতাভিত্তিক পথই সবচেয়ে নিরাপদ ও টেকসই। এডিআর সেই পথেরই একটি কার্যকর হাতিয়ার, যা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে নির্বাচনকালীন অস্থিরতার মধ্যেও শিল্পাঞ্চলে শান্তি, উৎপাদন ও আস্থা বজায় রাখা সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত