গাজায় আগ্রাসন অব্যাহত, যুদ্ধবিরতির মধ্যেই বাড়ছে সংকট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫১ বার
গাজা আগ্রাসন

প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজা উপত্যকায় ঝড়ের তাণ্ডব কিছুটা থেমেছে, কিন্তু থামেনি ইসরাইলি আগ্রাসন। বরং প্রকৃতির দুর্যোগ আর মানবসৃষ্ট সহিংসতা একসঙ্গে মিলিত হয়ে ফিলিস্তিনিদের জীবনে নেমে এসেছে ভয়াবহ মানবিক সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির কাগুজে আশ্বাসের বিপরীতে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও ইসরাইলি হামলায় গাজায় নিহত হয়েছেন প্রায় ৪০০ ফিলিস্তিনি। বোমা ও গোলার শব্দের সঙ্গে যোগ হয়েছে শীতকালীন ঝড়, প্রবল বৃষ্টি আর বন্যার ভয়াবহতা—সব মিলিয়ে গাজা যেন আজ এক বিশাল মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক।

১০ অক্টোবর ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক মহল আশা করেছিল, অন্তত সাময়িকভাবে হলেও গাজাবাসী কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে। কিন্তু সেই আশার আলো দ্রুতই ম্লান হয়ে যায়। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরাইল প্রায় ৮০০ বার চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৩৮৬ জন ফিলিস্তিনি। আহত হয়েছেন আরও কয়েক হাজার মানুষ, যাদের বড় একটি অংশ নারী ও শিশু।

একদিকে ইসরাইলি বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ, অন্যদিকে প্রবল শীতকালীন ঝড়—এই দুইয়ের চাপে গাজার পরিস্থিতি চরমভাবে অবনতির দিকে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক ঝড় ও ভারী বৃষ্টিতে গাজার বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী শরণার্থী শিবির পানিতে তলিয়ে গেছে। যুদ্ধের কারণে যাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, তারা তাঁবুতে বা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছিলেন। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে সেই তাঁবুগুলোও ভেসে গেছে কিংবা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। শিশুরা ঠান্ডায় কাঁপছে, বৃদ্ধরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, আর পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও ওষুধের অভাবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

এই সংকটের মধ্যেও ত্রাণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফিলিস্তিনি সূত্রগুলো জানায়, তাঁবু, কম্বল, শীতবস্ত্রসহ জরুরি ত্রাণসামগ্রী গাজায় প্রবেশে ইসরাইলি বাহিনী বাধা দিচ্ছে। ফলে শীত থেকে বাঁচতে গাজাবাসী ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের ধ্বংসাবশেষ, টিনের টুকরো, প্লাস্টিক ও কাঠ সংগ্রহ করে নতুন করে অস্থায়ী আশ্রয় তৈরির চেষ্টা করছে। মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে গাজায় ঠান্ডাজনিত রোগ, অপুষ্টি ও সংক্রামক ব্যাধি ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গাজা ছাড়াও অধিকৃত পশ্চিম তীরেও সহিংসতা থামেনি। জেরিকো শহরের কাছে রাতভর হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা। এই হামলায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্য আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে এক শিশুও রয়েছে। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, আহত বাবা-মা ও তাদের তিন কন্যাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোররাতে ইসরাইলি সেনারা শহরের কেন্দ্রস্থলে অভিযান চালানোর সময়ই বসতি স্থাপনকারীরা ওই পরিবারের ওপর হামলা চালায়। একই সময়ে আর-রাম শহরে এক যুবককে গুলি করে আহত করেছে ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ)।

শুধু হামলাই নয়, পশ্চিম তীরের নূর শামস শরণার্থী শিবিরে বসতবাড়ি ধ্বংসের উদ্যোগও নিয়েছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। চলতি সপ্তাহেই শিবিরটির অন্তত ২৫টি আবাসিক ভবন ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। নূর শামস শিবিরটি তুলকারেম গভর্নরেটের অন্তর্ভুক্ত। গভর্নর আবদুল্লাহ কামিল জানিয়েছেন, ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা কো-অর্ডিনেটর অব গভর্নমেন্ট অ্যাকটিভিটিজ ইন দ্য টেরিটরিজ (সিওজিএটি) তাকে এই ধ্বংসযজ্ঞের পরিকল্পনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এই ধ্বংসযজ্ঞ নতুন করে হাজারো মানুষকে গৃহহীন করে তুলবে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গাজা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। গাজায় সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ তদন্ত ঠেকাতে ইসরাইল যে আবেদন করেছিল, তা প্রত্যাখ্যান করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। সোমবার আইসিসির আপিল বিভাগ ইসরাইলের করা একাধিক আইনি চ্যালেঞ্জের মধ্যে সর্বশেষ এই আবেদনটি নাকচ করে দেয় এবং নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখার নির্দেশ দেয়। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর ২০২৩-এ দক্ষিণ ইসরাইলে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে সংঘটিত কথিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্তের আওতায় থাকবে।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

এই সিদ্ধান্তের ফলে ফিলিস্তিন বিষয়ে আইসিসির তদন্ত অব্যাহত রাখার পথ আরও সুগম হলো। গত বছরের নভেম্বরে এই তদন্তের অংশ হিসেবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। যদিও ইসরাইল শুরু থেকেই নেদারল্যান্ডসের হেগভিত্তিক এই আদালতের এখতিয়ার স্বীকার করে না, তবুও আন্তর্জাতিক পরিসরে এই সিদ্ধান্ত বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।

এদিকে হামাসের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে, ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করছে। হামাসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এসব অভিযোগ এবার তদন্ত করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়। তবে ট্রাম্প প্রশাসন জনসমক্ষে এখনো এই লঙ্ঘন নিয়ে স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেনি।

ইসরাইলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার পশ্চিম গাজা শহরের আল-নাবুলসি স্কয়ারের কাছে রাদ সাদের গাড়ি লক্ষ্য করে ইসরাইলি হামলা চালানো হয়। এতে রাদ সাদসহ চারজন নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ড যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, একের পর এক হামলা শুধু শান্তি উদ্যোগকে ব্যর্থই করছে না, বরং অঞ্চলে সহিংসতার নতুন চক্রকে উসকে দিচ্ছে।

গাজাবাসীর জন্য এখন প্রতিটি দিনই বেঁচে থাকার সংগ্রাম। যুদ্ধ, অবরোধ, শীত ও অনিশ্চয়তার মধ্যে তারা আজ বিশ্ব বিবেকের দিকে তাকিয়ে আছে। ঝড় থেমেছে বটে, কিন্তু ইসরাইলি হামলার ঝড় এখনো থামেনি—আর সেই ঝড়ের নিচে প্রতিনিয়ত ভেঙে পড়ছে ফিলিস্তিনিদের জীবন ও স্বপ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত