গণহারে দেশত্যাগে সংকটে ইসরাইলি সেনাবাহিনী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১৮ বার

প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

ইসরাইলি সেনাদের গণহারে দেশত্যাগ দেশটির সামরিক কাঠামোকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শত শত সেনা সদস্য একযোগে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মকর্তা ও নন-কমিশনড অফিসার দেশ ছাড়ছেন বলে জানিয়েছে ইসরাইলি গণমাধ্যম। এই পরিস্থিতি শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়, বরং ইসরাইলি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতরে জমে ওঠা দীর্ঘদিনের চাপ, মানসিক ক্লান্তি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

টিআরটি ওয়ার্ল্ডসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত নিয়মিত বাহিনীর অফিসার ও নন-কমিশনড অফিসারদের কাছ থেকে প্রায় ৫০০টি পদত্যাগ আবেদন জমা পড়েছে। যদিও এসব আবেদন ঠিক কোন সময়ের মধ্যে জমা হয়েছে তা স্পষ্ট করা হয়নি, তবুও সামরিক নেতৃত্ব বিষয়টিকে ‘অভূতপূর্ব’ বলে বিবেচনা করছে। সেনাবাহিনীর ভেতর থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সামনের মাসগুলোতে আরও বড় ধরনের জনবল সংকট দেখা দিতে পারে।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক সংঘাত, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিস্থিতি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এবং আন্তর্জাতিক চাপ সেনা সদস্যদের ওপর তীব্র মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করেছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, এই চাপের ফলেই অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত সেনা সদস্যরা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত জীবনের কথা ভেবে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

সামরিক সূত্রের বরাতে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শুধু সাধারণ সৈনিক নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অভিজ্ঞ অফিসাররাও চাকরি ছাড়ছেন। এতে করে কমান্ড কাঠামো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেনাবাহিনীর নিয়মিত বাহিনীতে যারা দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন, তাদের চলে যাওয়া নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার এই ঘাটতি ভবিষ্যতে সামরিক অভিযানের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন।

এই প্রেক্ষাপটে ইসরাইলি সেনাবাহিনী সেনা সদস্যদের দেশত্যাগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্কতা জারি করেছে। সামরিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সেনা সদস্যদের হঠাৎ করে দেশ ছেড়ে যাওয়া জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে তারা সেনা সদস্যদের পদত্যাগ না করার জন্য রাজি করাতে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে বাস্তবে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকটের পেছনে শুধু সামরিক কারণ নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করছে। ইসরাইলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে ক্ষোভ সেনা সদস্যদের মানসিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলছে। অনেক সেনা মনে করছেন, দীর্ঘদিন যুদ্ধ ও সংঘাতে জড়িত থাকার ফলে তাদের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

মানবাধিকার ও শান্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজা ও পশ্চিম তীরে চলমান সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের বিরুদ্ধে সমালোচনা সেনা সদস্যদের মধ্যে নৈতিক দ্বন্দ্বও সৃষ্টি করছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এসব অভিযানে অংশ নেওয়ার ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এই ভয়ের কারণে অনেক সেনা সদস্য নিরাপদ জীবন বেছে নিয়ে দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

এদিকে সামরিক কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে, সেনাবাহিনী বর্তমানে জনবল সংকটের মুখে রয়েছে। নিয়মিত বাহিনীতে স্থায়ী কর্মীদের মধ্য থেকে আরও পদত্যাগের আবেদন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে সামরিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নতুন করে হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে।

ইসরাইলি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তা শুধু সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ শক্তি নয়, বরং দেশের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা নীতিকেও দুর্বল করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ইসরাইলের জন্য একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সেনাবাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে অভিজ্ঞ জনবলের ঘাটতি ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সরকারি পর্যায়ে এখনো এই সংকট নিয়ে বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, সেনা সদস্যদের ধরে রাখতে আর্থিক প্রণোদনা, কর্মপরিবেশ উন্নয়ন এবং মানসিক সহায়তা কর্মসূচির মতো পদক্ষেপ বিবেচনায় আনা হতে পারে। পাশাপাশি সামরিক নেতৃত্ব রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত