প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
স্পেনের ঐতিহ্যবাহী নকআউট টুর্নামেন্ট কোপা দেল রে বরাবরই অঘটনের মঞ্চ হিসেবে পরিচিত। এখানে বড় দলগুলোকেও অনেক সময় পড়তে হয় অপ্রত্যাশিত চাপে। তৃতীয় স্তরের দলের বিপক্ষে খেলতে নামলেও প্রতিটি ম্যাচেই সতর্ক থাকতে হয়, কারণ একটি ভুলই ছিটকে দিতে পারে টুর্নামেন্টের বাইরে। ঠিক এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল ইউরোপের অন্যতম সেরা ক্লাব বার্সেলোনা। কোপা দেল রে’র রাউন্ড অব ৩২-এ মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) তৃতীয় স্তরের ক্লাব গুয়াদালাজারার বিপক্ষে মাঠে নেমে শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলের জয় পেলেও ম্যাচজুড়ে হ্যান্সি ফ্লিকের দলকে রীতিমতো ঘাম ঝরাতে হয়েছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই বল দখলে একচেটিয়া আধিপত্য দেখায় বার্সেলোনা। তবে নামের ভার, পরিসংখ্যান কিংবা দলগত শক্তির পার্থক্য মাঠে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। তৃতীয় স্তরের দল হওয়া সত্ত্বেও গুয়াদালাজারা খেলেছে সাহসী ফুটবল। রক্ষণভাগে তারা ছিল অত্যন্ত সংগঠিত এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ। বার্সার আক্রমণভাগের একের পর এক প্রচেষ্টা তারা ঠেকিয়ে দিয়েছে দৃঢ়তা আর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে।
এই ম্যাচে কোচ হ্যান্সি ফ্লিক মূল একাদশের বেশ কয়েকজন তারকাকে বিশ্রামে রাখেন। লিগ ও ইউরোপীয় ব্যস্ত সূচির কারণে তিনি তরুণ ও কম ব্যবহৃত খেলোয়াড়দের সুযোগ দেন। সেই সঙ্গে দলে কিছু নতুন সমন্বয়ও দেখা যায়। যদিও বল পজিশনে ও পাসিং গেমে বার্সেলোনা স্বাভাবিক আধিপত্য বজায় রাখে, তবু আক্রমণে কাঙ্ক্ষিত ধার ছিল না। শেষ তৃতীয়াংশে গিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা ও সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রথমার্ধে বার্সেলোনার আক্রমণ ছিল অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। কয়েকটি হাফ চান্স তৈরি হলেও সেগুলো থেকে গোল আদায় করা সম্ভব হয়নি। গুয়াদালাজারার গোলরক্ষক ও ডিফেন্স লাইন বার্সার আক্রমণভাগকে বেশ ভোগায়। মাঝমাঠে বলের দখল থাকলেও তা থেকে কার্যকর সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয় কাতালান জায়ান্টরা। ফলে প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্য অবস্থায়।
দ্বিতীয়ার্ধে ফেরার পরও একই চিত্র দেখা যায়। বার্সেলোনা আক্রমণের গতি বাড়ালেও গোলের দেখা পাচ্ছিল না। ম্যাচের ৩০ মিনিট পেরিয়ে যাওয়ার পরও স্কোরলাইন ছিল ০-০। এই সময়টায় গুয়াদালাজারার সমর্থকরা গ্যালারিতে আরও উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে, হয়তো ইতিহাস গড়া সম্ভব। অন্যদিকে বার্সেলোনা শিবিরে বাড়ছিল চাপ ও উৎকণ্ঠা।
অবশেষে ম্যাচের ৭৬তম মিনিটে আসে সেই স্বস্তির মুহূর্ত। মাঝমাঠ থেকে ডি ইয়ংয়ের নিখুঁত ক্রস বক্সে ভাসিয়ে দেন। সেখানে ডিফেন্ডার আন্দ্রেয়াস ক্রিস্টেনসেন সময়োপযোগী দৌড়ে হেড করে বল জালে পাঠান। একজন ডিফেন্ডারের গোলই ভাঙে গুয়াদালাজারার শক্ত প্রতিরোধ। এই গোলের পর বার্সেলোনার খেলায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে, আর গুয়াদালাজারার রক্ষণে দেখা দেয় ক্লান্তির ছাপ।
গোল হজম করার পর গুয়াদালাজারা কিছুটা ঝুঁকি নিতে বাধ্য হয়। তারা আক্রমণে লোক বাড়ায়, যার সুযোগ নেয় বার্সেলোনা। নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে ম্যাচ কার্যত নিশ্চিত করে নেয় কাতালানরা। তরুণ প্রতিভা ইয়ামালের চোখধাঁধানো থ্রু পাস ডি-বক্সে পেয়ে যান মার্কাস র্যাশফোর্ড। ইংলিশ ফরোয়ার্ড দারুণ নিয়ন্ত্রণে বল ধরে গোলরক্ষককে কাটিয়ে শান্ত মাথায় জাল খুঁজে নেন। এই গোলের মাধ্যমে বার্সেলোনার জয় নিশ্চিত হয় ২-০ ব্যবধানে।
যদিও স্কোরলাইন দেখে ম্যাচটি একপেশে মনে হতে পারে, বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। পুরো ম্যাচে গুয়াদালাজারার সাহসী পারফরম্যান্স বার্সেলোনাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছিল। ছোট দলের বিপক্ষে এমন লড়াই কোপা দেল রে’র সৌন্দর্যকেই তুলে ধরে। এই টুর্নামেন্টে নামী ক্লাবগুলোকে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়, কারণ এখানে প্রতিপক্ষের নাম নয়, পারফরম্যান্সই শেষ কথা।
এই ম্যাচে বার্সেলোনার জন্য ইতিবাচক দিক ছিল রক্ষণভাগের দৃঢ়তা। গুয়াদালাজারার আক্রমণ খুব বেশি না হলেও বার্সার ডিফেন্স ছিল মনোযোগী। গোল হজম না করেই ম্যাচ শেষ করা কোচ ফ্লিকের জন্য স্বস্তির খবর। পাশাপাশি তরুণ খেলোয়াড়দের ম্যাচ টাইম দেওয়ার সুযোগও তিনি কাজে লাগাতে পেরেছেন। যদিও আক্রমণভাগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
ম্যাচ শেষে হ্যান্সি ফ্লিকের জন্য এই জয় ছিল আত্মবিশ্বাস ফেরানোর উপলক্ষ। বড় টুর্নামেন্টে এগিয়ে যেতে গেলে এমন কঠিন ম্যাচ জিততে জানা জরুরি। তৃতীয় স্তরের দল হলেও গুয়াদালাজারার বিপক্ষে সহজ জয় না পাওয়াই বার্সেলোনাকে ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক বার্তা দিচ্ছে। পরের রাউন্ডে আরও শক্ত প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হলে আক্রমণে গতি ও নিখুঁততা বাড়াতে হবে—এ বিষয়টি নিশ্চয়ই ফ্লিকের পরিকল্পনায় থাকবে।
সব মিলিয়ে, কোপা দেল রে’র পরের রাউন্ডে উঠেছে বার্সেলোনা, কিন্তু এই ম্যাচ তাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ফুটবলে কোনো প্রতিপক্ষই ছোট নয়। নাম, ইতিহাস আর সাফল্যের পাশাপাশি মাঠে সর্বোচ্চটা দিতে না পারলে যে কোনো মুহূর্তে বিপদ আসতে পারে। গুয়াদালাজারার বিপক্ষে ঘাম ঝরানো এই জয় হয়তো ট্রফির পথে বার্সেলোনার জন্য একটি মূল্যবান শিক্ষা হয়ে থাকবে।