প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ছেঁড়া নোট বদলে দেওয়ার নির্দেশ বাংলাদেশ ব্যাংকের—এই সিদ্ধান্ত দেশের সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী এবং ব্যাংকিং সেবাগ্রহীতাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল, অনেক ব্যাংক শাখায় ছেঁড়া, ক্ষতিগ্রস্ত বা ময়লা নোট বদলাতে গেলে গ্রাহকদের নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। কোথাও সেবায় গড়িমসি, কোথাও অজুহাত, আবার কোথাও সরাসরি নোট গ্রহণে অনীহা দেখানো হতো। এমন বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কড়া নির্দেশনা নগদ লেনদেনে স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থ সুরক্ষার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট থেকে জারি করা এক সার্কুলারে দেশের সব তফসিলি ব্যাংক শাখাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ছেঁড়া, ক্ষতিগ্রস্ত ও ময়লা নোট বদলের সেবা কোনোভাবেই বন্ধ বা সীমিত করা যাবে না। এই নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সার্কুলারে সতর্ক করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এটি শুধু একটি প্রশাসনিক নির্দেশ নয়, বরং জনগণের প্রতি ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব পালনের বিষয়।
সার্কুলারে নোট বিনিময়ের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালাও তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো নোটের ৯০ শতাংশের বেশি অংশ যদি অক্ষত থাকে এবং নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য সঠিকভাবে দৃশ্যমান হয়, তাহলে সেই নোট ইস্যু-অযোগ্য বা বিকৃত হলেও ব্যাংক শাখাকে গ্রাহককে তার সম্পূর্ণ বিনিময়মূল্য পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ নোটটি কিছুটা ছেঁড়া, ময়লা বা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যদি মূল অংশ অক্ষত থাকে, তবে গ্রাহককে আর ফেরত দেওয়া বা হয়রানির সুযোগ থাকবে না।
দুই টুকরা হয়ে যাওয়া নোটের ক্ষেত্রে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এমন নোট সহজে শনাক্ত ও যাচাই করার জন্য পাতলা সাদা কাগজে সংযুক্ত করে জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নোটের আসলত্ব এবং অক্ষত অংশ সহজে যাচাই করতে পারবে। তবে সার্কুলারে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, দাবি-যোগ্য নোট শাখা পর্যায়ে নিষ্পত্তি করা যাবে না। এসব নোট সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখাকে নিকটবর্তী বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যালয়ে পাঠাতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দাবি-যোগ্য নোট যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। যাচাই-বাছাই শেষে সর্বোচ্চ আট সপ্তাহের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করা হবে। যদিও এই সময়সীমা কিছুটা দীর্ঘ বলে মনে হতে পারে, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, জাল নোট বা প্রতারণামূলক দাবি ঠেকাতে এই সময় প্রয়োজন। দাবি-যোগ্য নোট পাঠানোর ক্ষেত্রে ডাক বা কুরিয়ার খরচ গ্রাহককেই বহন করতে হবে বলেও সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে, যা নিয়ে কিছুটা আলোচনা তৈরি হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এটি একটি বিদ্যমান প্রক্রিয়ার অংশ।
আগুনে পুড়ে যাওয়া নোটের ক্ষেত্রেও আলাদা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, আগুনে পুড়ে যাওয়া নোট সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্লেইম ডেস্কে জমা দিতে হবে। এসব নোট শাখা পর্যায়ে গ্রহণ বা নিষ্পত্তি করা যাবে না। আগুনে পোড়া নোট সাধারণত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং যাচাই জটিল হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি এই দায়িত্ব নিজের হাতে রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক একই সঙ্গে জাল নোট ও তথাকথিত ‘বিল্ট-আপ’ নোট নিয়েও সতর্ক করেছে। একাধিক টুকরা জোড়া দিয়ে তৈরি করা বা জাল নোট শনাক্ত হলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সার্কুলারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন গ্রাহকদের অধিকার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে জাল নোট চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াও সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সার্কুলারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনসচেতনতা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশ দিয়েছে, ছেঁড়া, ক্ষতিগ্রস্ত ও দাবি-যোগ্য নোট বদলানোর সেবা ব্যাংকে পাওয়া যায়—এই তথ্য উল্লেখ করে প্রতিটি ব্যাংক শাখাকে দৃশ্যমান স্থানে নোটিস টাঙাতে হবে। এতে গ্রাহকরা সহজেই জানতে পারবেন, নোট বদলানো তাদের অধিকার এবং ব্যাংক তা দিতে বাধ্য। দীর্ঘদিন ধরে তথ্যের অভাবে অনেক গ্রাহকই জানতেন না যে, ছেঁড়া নোট বদলানো ব্যাংকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
নগদ লেনদেনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, প্রতি মাসে কত পরিমাণ ছেঁড়া, ক্ষতিগ্রস্ত ও দাবি-যোগ্য নোট গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করা হয়েছে, সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে। এতে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম তদারকি সহজ হবে এবং কোনো শাখা নির্দেশনা মানছে কি না, তা সহজেই যাচাই করা সম্ভব হবে।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই নির্দেশনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে গ্রাহক হয়রানি অনেকাংশে কমবে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকাগুলোতে ছেঁড়া বা ময়লা নোট নিয়ে সমস্যায় পড়া সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন। বাজারে লেনদেনের সময় অনেক সময় ছেঁড়া নোট নিতে অনীহা দেখান ব্যবসায়ীরা, ফলে সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়েন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ সেই সংকট কিছুটা হলেও লাঘব করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দেশের অর্থনীতিতে এখনো নগদ লেনদেনের গুরুত্ব অনেক বেশি। সেখানে যদি ছেঁড়া বা ক্ষতিগ্রস্ত নোট বিনিময়ে অনিশ্চয়তা থাকে, তবে সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্দেশনা সেই আস্থাকে শক্তিশালী করবে।