প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর নতুন এজলাসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। বুধবার বিকেল ৩টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি নতুন এজলাস উদ্বোধন করেন। এ সময় বিচার বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতি এই উদ্যোগের গুরুত্ব ও তাৎপর্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার, ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীসহ উভয় ট্রাইব্যুনালের অন্যান্য বিচারকরা। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী, চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এবং ট্রাইব্যুনালের একাধিক প্রসিকিউটর ও কর্মকর্তা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ তার বক্তব্যে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কেবল অতীতের অন্যায়কে সামনে আনার প্রক্রিয়া নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য ন্যায়বিচার, দায়বদ্ধতা ও আইনের শাসনের একটি শক্ত বার্তা। নতুন এজলাস উদ্বোধনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারকাজ আরও সুষ্ঠু পরিবেশে পরিচালিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর কার্যক্রম ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণের একটি টিনশেড ভবনে চলছিল। সীমিত পরিসর ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিচারকাজ পরিচালনায় নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতো সংশ্লিষ্টদের। অপরদিকে ট্রাইব্যুনাল-১ এর কার্যক্রম চলছিল মূল ভবনে। এই বৈষম্য দূর করতে এবং উভয় ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমকে সমমানের সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনতে নতুন এজলাস নির্মাণ ও সংস্কার কাজ হাতে নেওয়া হয়। দীর্ঘ সময়ের সংস্কার ও প্রস্তুতির পর অবশেষে নতুন এজলাস উদ্বোধনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারকাজ মূল ভবনের আধুনিক ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে স্থানান্তরিত হলো।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন ও নিখোঁজের অভিযোগসহ ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলমান রয়েছে। এসব মামলার গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নিয়ে বিচার কার্যক্রমকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। নতুন এজলাস চালু হওয়ায় বিচারক, প্রসিকিউশন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারবেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, নতুন এজলাস শুধু একটি ভবন নয়, এটি বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, উন্নত অবকাঠামো ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থাকায় মামলাগুলোর শুনানি নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এতে করে দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোও কিছুটা স্বস্তি পাবে।
আইন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নতুন এজলাস উদ্বোধন বিচার বিভাগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ইতোমধ্যেই নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে বিচারকাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত সক্ষমতা একটি বড় বিষয়। নতুন এজলাস চালু হওয়ায় বিচারকাজের গতি যেমন বাড়বে, তেমনি বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থাও আরও দৃঢ় হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিচারপতি ও কর্মকর্তারা নতুন এজলাসের পরিকাঠামো ঘুরে দেখেন। আধুনিক কোর্টরুম, পর্যাপ্ত আসনব্যবস্থা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত সুবিধা যুক্ত করায় এজলাসটি বিচারকার্যের জন্য অধিক উপযোগী হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। অতীতের গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে—কোনো অপরাধই বিচারের ঊর্ধ্বে নয়। নতুন এজলাস উদ্বোধনের মাধ্যমে সেই বার্তাই আবারও জোরালোভাবে উচ্চারিত হলো।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর নতুন এজলাস উদ্বোধন বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন। এখন দেখার বিষয়, এই উন্নত অবকাঠামোর সুফল কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হয়।