প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থী আব্দুল হান্নান মাসউদকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকির অভিযোগকে ঘিরে স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র উদ্বেগ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক স্ক্রিনশটে প্রাণনাশের হুমকির তথ্য সামনে আসার পর বিষয়টি আরও গুরুতর রূপ নেয়। এই ঘটনায় হাতিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে, যা স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে করা জিডিতে উল্লেখ করা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও মেসেঞ্জার ব্যবহার করে আব্দুল হান্নান মাসউদ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এসব হুমকির স্ক্রিনশট রাতেই ভাইরাল হলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক কর্মী, সমর্থক ও স্থানীয় বাসিন্দারা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
আব্দুল হান্নান মাসউদের চাচা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির হাতিয়া উপজেলা সমন্বয় কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী হেডমাস্টার শামছল তিব্রিজ থানায় জিডিটি করেন। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরেই তার ভাতিজাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টার্গেট করে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেই হুমকি আরও স্পষ্ট ও প্রকাশ্য হয়ে ওঠায় পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
জিডিতে বলা হয়, ১৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টা ৪ মিনিটে ‘রুপক নন্দী’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে আব্দুল হান্নান মাসউদকে সরাসরি হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। একই দিনে বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে ‘Israt Raihan Ome’ নামের আরেকটি ফেসবুক আইডি থেকে এনসিপির এক কর্মীর মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠিয়ে হান্নান মাসউদ ও তার সহযোগীদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। এসব বার্তায় প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি থাকায় বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সাধারণ ডায়েরিতে মোট সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। জিডিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, অভিযুক্তরা যেকোনো সময় বড় ধরনের ক্ষতি সাধন করতে পারে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন হাতিয়া উপজেলার কান্তি লালের ছেলে রুপক নন্দী, চরঈশ্বর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হালিম আজাদ, তার ছেলে ইসরাত রায়হান অমি, সংকর চন্দ্রের ছেলে প্রেম নাল, তোফায়েল সেরাংয়ের ছেলে নুর হোসেন রহিম, সংকর চন্দ্র দাসের ছেলে বাবুলাল এবং বেলায়েত হোসেনের ছেলে ওমর ফারুক।
জানা গেছে, ভাইরাল হওয়া স্ক্রিনশটগুলোর একটি অংশ চরঈশ্বর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হালিম আজাদের ছেলে ইসরাত রায়হান অমির এবং তার অনুসারী হিসেবে পরিচিত রুপক নন্দীর ফেসবুক ও মেসেঞ্জার অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা। এসব স্ক্রিনশটে ব্যবহৃত ভাষা ও হুমকির ধরন স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
স্ক্রিনশটে দেখা যায়, মেসেঞ্জারে পাঠানো এক বার্তায় ইসরাত রায়হান অমি লেখেন, আবদুল হালিম আজাদকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হলে উত্তর অঞ্চলে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের চলাচল ‘হারাম’ হয়ে যাবে এবং নেতাকর্মীরা সরাসরি প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। বার্তাটিতে হুমকির সুর স্পষ্ট, যা অনেকের কাছে সরাসরি সহিংসতার উসকানি হিসেবে ধরা পড়েছে।
অন্যদিকে রুপক নন্দীর ফেসবুক পোস্টে আব্দুল হান্নান মাসউদকে উদ্দেশ করে কঠোর ভাষায় সতর্ক করা হয়। সেখানে বলা হয়, তিনি যেন ‘আগুন নিয়ে খেলা’ না করেন, নইলে পরে পস্তাতে হবে। পোস্টে আরও দাবি করা হয়, কোনো নেতাকে গ্রেপ্তার করা হলে উত্তরাঞ্চলে তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে। এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন মহল থেকে নিন্দা ও প্রতিবাদ ওঠে।
হান্নান মাসউদের চাচা শামছল তিব্রিজ গণমাধ্যমকে বলেন, তার ভাতিজাকে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক হুমকি আসায় পরিবার ও সমর্থকেরা চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। যেকোনো সময় বড় ধরনের অঘটন ঘটতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন এবং প্রশাসনের কাছে হান্নান মাসউদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান।
হাতিয়া উপজেলা যুবশক্তির আহ্বায়ক মো. ইউসুফ রেজা বলেন, সম্প্রতি চরঈশ্বর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান একটি চা-দোকানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় মন্তব্য করেন যে, ভোটের আগে অনেক জনপ্রিয় প্রার্থীকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তার মতে, ওই বক্তব্যের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি-ধমকি শুরু হয় এবং সেটিই এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। তিনি দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
বাগছাসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান এই ঘটনাকে ন্যায় ও ইনসাফের পথে চলা রাজনীতিবিদদের জন্য অশনি সংকেত বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সহযোদ্ধা শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর মতো হান্নান মাসউদকেও প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, অথচ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়াকে তিনি চরম ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
হাফিজুর রহমান আরও বলেন, বর্তমান সরকার ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, হান্নান মাসউদসহ সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং সন্ত্রাসীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় কোনো পূর্বপরিকল্পিত ঘটনা ঘটলে তার দায় সরকার ও প্রশাসনকেই নিতে হবে।
আব্দুল হান্নান মাসউদ নিজেও গণমাধ্যমের কাছে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, হত্যার হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো ঘৃণ্য অপরাধ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরাসরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিনষ্টের অপচেষ্টা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর নগ্ন হামলা। তিনি জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করা হয়েছে এবং দোষীদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
হাতিয়া থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাইফুল আলম বলেন, ঘটনাটি পুলিশের নজরে এসেছে এবং একটি সাধারণ ডায়েরি গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি জানান, প্রাপ্ত স্ক্রিনশট ও অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের প্রকাশ্য হত্যার হুমকি শুধু একজন প্রার্থীর নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং সামগ্রিকভাবে দেশের নির্বাচনকালীন পরিবেশ ও গণতন্ত্রের জন্য বড় ধরনের হুমকি। তারা মনে করছেন, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে সহিংসতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। হাতিয়ার এই ঘটনা এখন স্থানীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।