যুক্তরাষ্ট্রে বিমান দুর্ঘটনায় ক্রীড়া তারকাসহ নিহত ৭

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৮ বার
যুক্তরাষ্ট্রে বিমান বিধ্বস্ত, ক্রীড়া তারকা গ্রেগ বিফেল নিহত

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনার স্টেটসভিল শহরে একটি ছোট বিমান বিধ্বস্ত হয়ে দেশটির ক্রীড়া জগতকে শোকস্তব্ধ করে দিয়েছে। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের মোটরগাড়ি রেসিংয়ের পরিচিত মুখ ও কিংবদন্তি রেসার গ্রেগ বিফেলসহ মোট সাতজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিফেলের পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। আকস্মিক এই দুর্ঘটনা কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতিই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া অঙ্গনের জন্যও এক গভীর শোকের অধ্যায় হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকালে নর্থ ক্যারোলাইনার স্টেটসভিল বিমানবন্দর থেকে ফ্লোরিডার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে ছোট আকারের ওই বিমানটি। জানা গেছে, অবসরজীবন উপভোগ করছিলেন ৫৫ বছর বয়সী গ্রেগ বিফেল। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ব্যক্তিগত সফরের উদ্দেশেই তিনি ওই বিমানে উঠেছিলেন। উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই আবহাওয়া দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে। আকাশে ঘন মেঘ, দমকা হাওয়া এবং দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নর্থ ক্যারোলাইনা হাইওয়ে পেট্রোল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় বেলা ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্টেটসভিল বিমানবন্দরের রানওয়েতেই আছড়ে পড়ে। আছড়ে পড়ার মুহূর্তেই বিমানটির জ্বালানি ট্যাংকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে এবং মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই বিমানটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায়।

পরে দমকল বাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে বিধ্বস্ত বিমানের ভেতর থেকে গ্রেগ বিফেলসহ সাতজনের দগ্ধ দেহাবশেষ উদ্ধার করেন। তাৎক্ষণিকভাবে কারও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা পাওয়া যায়নি। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্টেটসভিলসহ আশপাশের এলাকায় শোকের আবহ নেমে আসে। বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে আশপাশের সড়কেও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

গ্রেগ বিফেল ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের মোটরগাড়ি রেসিং অঙ্গনের এক সুপরিচিত ও সম্মানিত নাম। প্রায় দুই দশকের ক্যারিয়ারে তিনি জাতীয় ও স্টেট পর্যায়ে অসংখ্য রেসিং টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছেন। তার ঝুলিতে রয়েছে মোট ১৯টি চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা, যা তাকে সমসাময়িক রেসারদের মধ্যে অনন্য অবস্থানে নিয়ে যায়। রেসিং ট্র্যাকে তার আগ্রাসী কিন্তু নিয়ন্ত্রিত ড্রাইভিং স্টাইল, কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং ধারাবাহিক সাফল্য তাকে ভক্তদের কাছে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিল।

২০২২ সালে পেশাদার রেসিং থেকে অবসর নেন গ্রেগ বিফেল। অবসর গ্রহণের পর তিনি পরিবারকে সময় দেওয়া, তরুণ রেসারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গাড়ি রেসিং আয়োজক সংস্থা ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর স্টক কার অটো রেসিং (নাসকার) প্রণীত সর্বকালের সেরা ৭৫ জন রেসারের তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় স্বীকৃতি। সহকর্মী ও ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন একাধারে অনুপ্রেরণা ও আদর্শ।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাসকার সংশ্লিষ্ট রেসার, ক্রীড়া সংগঠক ও ভক্তরা শোকবার্তা জানাচ্ছেন। অনেকেই গ্রেগ বিফেলের সাহসী ক্যারিয়ার, তার সাফল্য এবং মানবিক দিকের কথা স্মরণ করে আবেগঘন বার্তা প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ এটিকে নাসকার পরিবারের জন্য ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ইতোমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে মার্কিন সড়ক ও বিমান নিরাপত্তা বিষয়ক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড (এনটিএসবি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে খারাপ আবহাওয়াকে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বিমানটির যান্ত্রিক অবস্থা, পাইলটের সিদ্ধান্ত, রানওয়ের পরিস্থিতি এবং ফ্লাইট কন্ট্রোল সিস্টেমের সব দিক খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করা হবে না বলেও জানিয়েছে তারা।

স্টেটসভিল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পরপরই বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং সব ধরনের উড্ডয়ন ও অবতরণ স্থগিত রাখা হয়। নিরাপত্তা ঝুঁকি কাটিয়ে ওঠার পর সীমিত আকারে কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট বিমানে ভ্রমণের ক্ষেত্রে আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে কুয়াশা, ঝড়ো হাওয়া ও কম দৃশ্যমানতা পাইলটদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। এই দুর্ঘটনা আবারও বিমান নিরাপত্তা, আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং উড্ডয়নের সময় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব সামনে নিয়ে এসেছে।

গ্রেগ বিফেলের মৃত্যু কেবল একজন সফল রেসারের জীবনের অবসান নয়; এটি একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। যে মানুষটি গতির সঙ্গে লড়াই করে, ঝুঁকিকে জয় করে রেসিং ট্র্যাকে ইতিহাস গড়েছিলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত আকাশপথের এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হলেন—এই বৈপরীত্য অনেককেই গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তার সহকর্মীরা বলছেন, রেসিং ট্র্যাকে যেমন তিনি সাহসী ছিলেন, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন পরিবারপ্রেমী ও দায়িত্বশীল।

দুর্ঘটনায় নিহত অন্যদের পরিচয় ও দাফন কার্যক্রম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে বিস্তারিত জানাবে বলে জানিয়েছে। তবে ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, এই দুর্ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া ও সামাজিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

শোকের এই সময়ে গ্রেগ বিফেল ও নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন দেশটির বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষ। তাদের স্মরণে নাসকারসহ বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠন শোক পালন ও বিশেষ শ্রদ্ধা আয়োজনের কথাও ভাবছে বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল—জীবন কতটা অনিশ্চিত, আর একটি মুহূর্তই কীভাবে বদলে দিতে পারে সবকিছু।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত