গাজায় যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কূটনৈতিক বৈঠক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫১ বার
গাজা যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বৈঠক

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ এবং এর পরবর্তী ধাপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। স্থানীয় সময় শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে যুক্তরাষ্ট্র, কাতার, তুরস্ক ও মিশরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে কাতার, মিশর ও তুরস্কের প্রতিনিধিরা গাজা পরিস্থিতি, যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করবেন।

হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তার বরাতে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ কার্যকর থাকার পরবর্তী সময়কে সামনে রেখে এই বৈঠককে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এই আলোচনাতেই গাজায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য পথনকশা এবং রাজনৈতিক সমাধানের কাঠামো নিয়ে স্পষ্ট ধারণা উঠে আসতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর সমন্বিত এই উদ্যোগকে অনেক বিশ্লেষক দীর্ঘদিনের সংঘাত নিরসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন।

সূত্রগুলো জানায়, আলোচ্যসূচির কেন্দ্রে থাকবে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ। এই ধাপে ইসরাইলি সেনাদের গাজা উপত্যকা থেকে ধাপে ধাপে প্রত্যাহার, হামাসের পরিবর্তে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনের হাতে গাজার শাসনভার হস্তান্তর এবং একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব রয়েছে। এই অন্তর্বর্তী প্রশাসনের কাঠামো কেমন হবে, সেখানে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা কী হবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোন কোন দেশ দায়িত্ব নেবে—এসব বিষয়েই মূলত আলোচনা হওয়ার কথা।

গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এ ইস্যুতে তৎপরতা বেড়েছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রিসভার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান জানিয়েছে, ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা এবং তার প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

এক জ্যেষ্ঠ ইসরাইলি কর্মকর্তার বরাতে গণমাধ্যমটি আরও জানায়, যদি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন আসে অথবা রাজনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হয়, সে ক্ষেত্রে গাজায় নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করার বিকল্প পরিকল্পনাও আলোচনায় উঠে এসেছে। এই তথ্য সামনে আসার পর মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা বা ব্যর্থতা অঞ্চলটিকে আবারও সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে গাজা উপত্যকার মানবিক পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। শীতকালীন ঝড়, ভারি বৃষ্টি এবং তীব্র ঠান্ডার কারণে চলতি মাসেই অন্তত ১৭ জনের বেশি ফিলিস্তিনি মারা গেছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত এই অঞ্চলে ইসরাইল এখনও আশ্রয়সামগ্রী, জ্বালানি এবং অন্যান্য জরুরি মানবিক সহায়তা প্রবেশে কঠোর কড়াকড়ি বজায় রেখেছে। ফলে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ খোলা আকাশের নিচে অথবা অস্থায়ী ছাউনিতে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।

গাজা সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, ডিসেম্বরের শুরু থেকে টানা ভারি বৃষ্টি, ঝড়ো বাতাস এবং ঠান্ডার কারণে বহু ঘরবাড়ি, দেয়াল ও অস্থায়ী ছাউনি ধসে পড়েছে। এতে অনেক পরিবার তাদের সামান্য আশ্রয়টুকুও হারিয়েছে। শীতের তীব্রতায় শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত গরম কাপড়, কম্বল ও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় চিকিৎসাকর্মীরা।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর গাজা অঞ্চলে খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সীমিত আকারে হলেও খাদ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করতে পারায় অনেক পরিবার নিয়মিত খাবার পাচ্ছে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, শুধু খাদ্যের প্রাপ্যতা যথেষ্ট নয়। নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং মৌলিক অবকাঠামোর অভাবে গাজায় জীবনযাত্রার মান এখনও অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় রয়েছে।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

ডব্লিউএফপি আরও জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশে যে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে রেখেছে, তা যুদ্ধবিরতির মানবিক প্রটোকলের লঙ্ঘন। সংস্থাটির মতে, এই সীমাবদ্ধতা দ্রুত শিথিল না করা হলে শীতকালজুড়ে গাজায় মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে মিয়ামিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বৈঠককে শুধু রাজনৈতিক নয়, মানবিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কাতার ও মিশর দীর্ঘদিন ধরেই গাজা সংকটে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে আসছে, আর তুরস্ক প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই দেশগুলোর সমন্বিত আলোচনা যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন গতি আনতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে একই সঙ্গে সংশয়ও রয়েছে। কারণ, যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে আস্থার ঘাটতি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থের সংঘাত বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তা সত্ত্বেও কূটনৈতিক মহলের একটি অংশ মনে করছে, বর্তমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে গাজা ও পুরো মধ্যপ্রাচ্য আবারও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার মুখে পড়বে, যা কোনো পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে না।

সব মিলিয়ে, গাজায় যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বৈঠক শুধু চার দেশের কূটনৈতিক আলোচনাই নয়, বরং লাখো ফিলিস্তিনির ভবিষ্যৎ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বৈঠক শেষে কী ধরনের সিদ্ধান্ত বা বার্তা আসে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত