প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজশাহীতে ছাত্র-জনতার তীব্র বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো জেলা আওয়ামী লীগের মহানগর অফিস। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিল। তারা ভাঙচুর চালিয়ে শহরের কুমারপাড়ায় অবস্থিত আওয়ামী লীগের দুই তলা বিশিষ্ট অফিসকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে প্রথমে একটি বুলডোজার দিয়ে অফিসের একটি অংশ ধ্বংস করা শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা ঘণ্টাখানেক ধরে কাজ চালিয়ে এরপর আরও একটি বুলডোজার নিয়ে এসে পুরো ভবনটি ভেঙে দেয়। এ সময় উপস্থিত জনতা নানা ধরণের রাজনৈতিক এবং প্রতিবাদী স্লোগান উচ্চারণ করে। ভাঙচুরের সময় কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক এবং উত্তেজনা বিরাজ করেছিল।
এ ঘটনার আগে রাত ১১টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয় মিছিল। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে নগরীর সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে এসে অবস্থান নেয়। এসময় তারা আওয়ামী লীগ, ভারতের নীতি ও সাম্প্রতিক ঘটনার প্রতিবাদে একাধিক স্লোগান দেয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ মিছিল ও বিক্ষোভের সঙ্গে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন।
একই সময় রাজশাহীর সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জুলাই ৩৬ মঞ্চের নেতাকর্মীরাও বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বাহিনী কিছুটা উপস্থিত থাকলেও ভাঙচুর রোধ করতে পারছিল না। আন্দোলনরতরা বুলডোজার নিয়ে অফিস ভাঙা শুরু করলে পুরো শহর আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ওঠে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্র-জনতা দ্রুত কেন্দ্রীভূত হয়। তারা দাবি জানায়, স্বৈরাচারী নীতি ও সরকারের অনিয়মের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ চলবে। শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং শহরের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থন মিলিত হয়ে মহানগর আওয়ামী লীগের অফিসের ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়।
বিক্ষুব্ধ জনতা ভাঙচুর শেষে শুক্রবার ভোরে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সাধারণ মানুষ ধ্বংসপ্রাপ্ত অফিস থেকে ইট ও রড সংগ্রহ করতে দেখা যায়। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হয়।
রাজশাহীর পুলিশ কমিশনার অফিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বুলডোজার ও অন্যান্য সরঞ্জামের মাধ্যমে ঘটনার তদন্ত শুরু করা হয়েছে। অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং শিগগিরই আইনের আওতায় আনা হবে। তবে এই ভাঙচুর এবং আন্দোলন শহরের সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
রাজশাহীতে ছাত্র-জনতার এই তীব্র আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছে। এটি শুধুমাত্র হাদির মৃত্যুর প্রতি প্রতিবাদ নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত অনিয়মের বিরুদ্ধে জনমত প্রকাশের অংশ। আন্দোলনরতরা দাবি করেছেন, যদি না তাদের দাবি পূরণ করা হয়, তবে তারা আরও বড় আন্দোলনে নামবেন।
শহরের সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করছেন। তবে এই ঘটনা প্রমাণ করছে, ছাত্র-জনতার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা এবং শহরে অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মানসিকতা কতটা প্রবল।
রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ অফিস ভাঙচুরের ঘটনায় রাজনৈতিক মহল ও নাগরিক সমাজের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ছাত্র-জনতা তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখার সংকল্প দেখাচ্ছেন।
প্রতিটি রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, গণমত ও তরুণ প্রজন্মের প্রতিক্রিয়া কখনোই অবহেলা করা যাবে না। হাদির মৃত্যু এবং তার প্রতিবাদে রাজশাহীতে ঘটে যাওয়া এই আন্দোলন শুধু স্থানীয় নয়, এটি দেশের রাজনৈতিক সচেতনতা ও শিক্ষার্থীদের সংগঠিত হওয়ার শক্তিকে প্রতিফলিত করছে।
এই ঘটনার পরও শহরে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা পরিস্থিতি শান্ত করতে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের উদ্দীপনা এবং জনসাধারণের সমর্থন এই ঘটনার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।