প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত সরকারি নিরাপত্তা গ্রহণে বিনীতভাবে অসম্মতি জানিয়েছেন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে সরকারের পক্ষ থেকে তাকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে নিজের অবস্থানে অটল থেকে তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
সরকারি সূত্র জানায়, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক ও মতপ্রকাশে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবেই মাহমুদুর রহমানকে নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) প্রধান সরাসরি মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। আলোচনায় সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং সরকারের দায়িত্বের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। কথোপকথনের পরবর্তী ধাপে এসবি প্রধানের নির্দেশনায় একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজ মাহমুদুর রহমানকে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে সরকারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন।
ওই বার্তায় উল্লেখ করা হয়, এসবি প্রধানের সঙ্গে তার আগেই কথা হয়েছে এবং নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত সময়ের মধ্যে ভিআইপি ব্যক্তিদের কাছে গানম্যান পাঠানোর প্রস্তুতি রয়েছে। বার্তায় আরও বলা হয়, সম্মতি দিলে তাৎক্ষণিকভাবে তার ঠিকানায় নিরাপত্তা কর্মী পাঠানো সম্ভব। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, তারা কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চায় না এবং একজন জ্যেষ্ঠ সম্পাদক হিসেবে মাহমুদুর রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
তবে এই প্রস্তাবের জবাবে মাহমুদুর রহমান সৌজন্যপূর্ণ কিন্তু দৃঢ় ভাষায় সরকারি নিরাপত্তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। পাল্টা বার্তায় তিনি এসবি প্রধানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তিনি সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা গ্রহণ করবেন না। তার সংক্ষিপ্ত কিন্তু অর্থবহ বক্তব্য ছিল, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি সরকারের কাছ থেকে আমি কোনো নিরাপত্তা নেবো না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রক্ষা করুন।’ এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যেই তা ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
মাহমুদুর রহমানের এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই ব্যক্তিগত বিশ্বাস, নীতিগত অবস্থান এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের প্রতীক হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের কঠোর বিশ্লেষণ এবং বিতর্কিত ইস্যুতে অবস্থান নেওয়ার জন্য পরিচিত। অতীতেও নানা চাপ, মামলা ও হয়রানির মুখে পড়লেও তিনি নিজ অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তার নিরাপত্তা প্রত্যাখ্যানের ঘটনাকে সেই ধারাবাহিকতারই অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন পর্যবেক্ষকরা।
অন্যদিকে, সরকারের দিক থেকেও বিষয়টি সংবেদনশীল। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা, সহিংস বিক্ষোভ, গণমাধ্যমে হামলা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে আক্রমণের ঘটনায় নিরাপত্তা ইস্যু সামনে এসেছে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার ঘটনার পর গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে একজন প্রভাবশালী সম্পাদককে নিরাপত্তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়াকে অনেকেই সরকারের দায়িত্বশীল আচরণ হিসেবে দেখছেন।
তবে মাহমুদুর রহমানের সিদ্ধান্ত এই আলোচনাকে নতুন মোড় দিয়েছে। তার সমর্থকদের মতে, সরকারি নিরাপত্তা গ্রহণ না করার মাধ্যমে তিনি স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি নিজের আস্থা ও আত্মবিশ্বাসের বার্তা দিয়েছেন। তারা মনে করেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বলয় অনেক সময়ই মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করতে পারে, আর সে কারণেই তিনি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই লিখছেন, এটি ব্যক্তিগত সাহস ও নৈতিক দৃঢ়তার দৃষ্টান্ত।
অন্যদিকে, সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছেন, বর্তমান বাস্তবতায় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রত্যাখ্যান করা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তাদের মতে, এটি কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়; একজন গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গণমাধ্যমের সামগ্রিক নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত। তারা বলছেন, নিরাপত্তা গ্রহণ মানেই যে স্বাধীনতা খর্ব হবে—এমনটি ভাবার সুযোগ নেই, বরং এটি একটি সাময়িক ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হতে পারত।
এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটলো, যখন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একদিকে নির্বাচনকেন্দ্রিক উত্তেজনা, অন্যদিকে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। এসবের মধ্যেই একজন প্রবীণ সম্পাদক সরকারের নিরাপত্তা প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মাহমুদুর রহমানের এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত হলেও এর প্রতীকী গুরুত্ব অনেক। এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার ভারসাম্য এবং সাংবাদিকতার স্বাধীন ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। সরকার যেমন তার দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছে, তেমনি একজন নাগরিক হিসেবে মাহমুদুর রহমান নিজের বিশ্বাস ও সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
সবশেষে বলা যায়, এই ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির নিরাপত্তা প্রত্যাখ্যানের গল্প নয়; বরং এটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি। যেখানে নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও বিশ্বাস—এই তিনের টানাপোড়েন স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ভবিষ্যতে এই সিদ্ধান্তের কী প্রভাব পড়বে, তা সময়ই বলে দেবে, তবে আপাতত এটি দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।