ফ্রান্সে ‘মৃত্যুর ডাক্তার’ ফ্রেডেরিখ পেচিয়েরের যাবজ্জীবন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ২১ বার

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

ফ্রান্সে মৃত্যুর ডাক্তার যাবজ্জীবন—এই শব্দবন্ধই এখন ইউরোপজুড়ে আলোচিত। একজন চিকিৎসক, যাঁর হাতে মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্ব, তিনিই যদি পরিকল্পিতভাবে রোগীর শরীরে বিষপ্রয়োগ করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেন, তাহলে তা কেবল অপরাধ নয়, বরং মানবতার ওপর এক গভীর আঘাত। ফ্রান্সের একটি আদালত ঠিক এমনই এক ভয়ংকর ঘটনার বিচার শেষে অবেদনবিদ ফ্রেডেরিখ পেচিয়েরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষের ভাষায়, তিনি শুধু একজন অপরাধী নন, তিনি ‘মৃত্যুর ডাক্তার’।

৫৩ বছর বয়সী ফ্রেডেরিখ পেচিয়ের একসময় সহকর্মীদের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘তারকা অবেদনবিদ’ হিসেবে। অস্ত্রোপচারের সময় রোগীকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। অথচ সেই দায়িত্বকেই তিনি পরিণত করেছিলেন মৃত্যুর ফাঁদে। আদালতে প্রমাণিত হয়, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্তত ৩০ জন রোগীর শরীরে বিষপ্রয়োগ করেছিলেন। এর মধ্যে ১২ জন রোগী প্রাণ হারান। বাকিরা কোনোভাবে বেঁচে গেলেও তাঁদের জীবন চিরতরে আতঙ্ক ও মানসিক ক্ষতের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি ক্রিস্টিন দে কুরাইজ আদালতে বলেন, ফ্রেডেরিখ একজন ‘ক্রমিক খুনি’ এবং তাঁর মানসিকতা ‘অত্যন্ত বিকৃত’। তাঁর মতে, অভিযুক্ত চিকিৎসক ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ওষুধ ও বিষ প্রয়োগ করতেন, যার ফলে রোগীর হৃদ্‌যন্ত্র বিকল হয়ে পড়ত এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতো। এই মৃত্যু ছিল পরিকল্পিত, ঠান্ডা মাথার এবং বারবার সংঘটিত।

আরেক কৌঁসুলি থেরেস ব্রুনিসো আরও কঠোর ভাষায় বলেন, ফ্রেডেরিখকে চিকিৎসক বলা যায় না। তিনি একজন অপরাধী, যিনি ওষুধকে হত্যা করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর বিষপ্রয়োগের শিকার রোগীদের বয়স ছিল মাত্র চার বছর থেকে শুরু করে ৮৯ বছর পর্যন্ত। অর্থাৎ শিশু থেকে বৃদ্ধ—কেউই তাঁর নিষ্ঠুরতার বাইরে ছিল না।

ফ্রান্সের পূর্বাঞ্চলের বেজঁসঁ শহরের একাধিক বেসরকারি ক্লিনিকে কাজ করার সময় এসব অপরাধ সংঘটিত হয়। ২০০৮ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে একের পর এক রোগী রহস্যজনকভাবে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হতে থাকেন। একই সময়ে ১২ জন রোগীর মৃত্যু ঘটে। শুরুতে বিষয়টি স্বাভাবিক চিকিৎসাজনিত জটিলতা বলে মনে হলেও, পরে ধারাবাহিক ঘটনার পেছনে একই ব্যক্তির উপস্থিতি সন্দেহের জন্ম দেয়।

তিন মাস ধরে চলা দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় আদালত খতিয়ে দেখার চেষ্টা করে, কেন একজন সফল ও প্রতিষ্ঠিত অবেদনবিদ এমন ভয়ংকর পথে হাঁটলেন। কৌঁসুলিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফ্রেডেরিখের উদ্দেশ্য সব সময় এক ছিল না। কখনো তিনি রোগীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে পরে নিজেই ‘উদ্ধারকারী’ সেজে ওঠার চেষ্টা করতেন। কিন্তু সেই উদ্ধার ছিল আন্তরিক নয়; বরং নিজের অপরাধ আড়াল করা এবং নিজেকে অন্যদের চেয়ে ‘শক্তিশালী’ প্রমাণ করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

আদালতে আরও উঠে আসে, সহকর্মীদের সঙ্গে ফ্রেডেরিখের সম্পর্ক ছিল জটিল ও দ্বন্দ্বপূর্ণ। যাঁদের তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন, তাঁদের সুনাম নষ্ট করতে এবং অযোগ্য প্রমাণ করতে তিনি রোগীদের জীবন নিয়ে ভয়ংকর খেলায় মেতে ওঠেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি এমন পরিস্থিতি তৈরি করতেন, যাতে সহকর্মীদের তত্ত্বাবধানে থাকা রোগী হঠাৎ সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। এতে সহকর্মীদের বিরুদ্ধে অবহেলা বা অদক্ষতার অভিযোগ উঠত, আর তিনি নিজে হয়ে উঠতেন ‘উদ্ধারকর্তা’।

কৌঁসুলি কুরাইজ বলেন, ক্ষমতার প্রতি প্রবল আকাঙ্ক্ষাই ছিল ফ্রেডেরিখের মূল চালিকাশক্তি। নিজের অযোগ্যতা, হতাশা ও আত্মসম্মানবোধের সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে তিনি রোগীদের জীবন নিয়ে খেলতেন। ধীরে ধীরে এই হত্যাকাণ্ড তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়। একজন চিকিৎসকের কাছে রোগীর মৃত্যু যেখানে ব্যর্থতার প্রতীক, সেখানে ফ্রেডেরিখের কাছে তা হয়ে উঠেছিল বিকৃত আনন্দ ও ক্ষমতার প্রদর্শন।

তবে আদালতে ফ্রেডেরিখ পেচিয়ের নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো কাউকে বিষ প্রয়োগ করিনি। আমি বিষ প্রয়োগকারী নই।’ রায়ের পরও তিনি অনড় থাকেন তাঁর অস্বীকারে। আইন অনুযায়ী, এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য তিনি ১০ দিনের সময় পাবেন।

ফ্রেডেরিখের ব্যক্তিগত জীবনও আদালতে আলোচিত হয়। তাঁর বাবা নিজেও ছিলেন একজন অবেদনবিদ। স্ত্রী একজন হৃদ্‌রোগ–বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তিন সন্তান নিয়ে তারা বড় একটি বাড়িতে বসবাস করতেন। বাইরে থেকে দেখলে ছিল সফল ও সম্মানজনক জীবন। তবে কয়েক বছর আগে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। রাষ্ট্রপক্ষের মতে, ব্যক্তিগত জীবনের এই ভাঙনও তাঁর মানসিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দিয়েছিল।

এই মামলার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায়গুলোর একটি হলো চার বছরের শিশু টেডির ঘটনা। টনসিলের সমস্যার জন্য অস্ত্রোপচারের সময় শিশুটি দুইবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হয়। সৌভাগ্যক্রমে সে বেঁচে যায়। আদালতে টেডির বাবা হার্ভে হোয়েরটার টারবে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা এক দুঃস্বপ্ন। আমরা চিকিৎসার ওপর বিশ্বাস রেখেছিলাম। এখন সেই বিশ্বাস ভেঙে চুরমার।’

ফ্রেডেরিখ পেচিয়েরের এই মামলার রায় ফ্রান্সে চিকিৎসা নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। যাঁদের ওপর মানুষ জীবন-মরণের ভার ছেড়ে দেয়, তাঁদের হাতেই যদি মৃত্যু নেমে আসে, তবে সমাজ কতটা নিরাপদ? আদালতের এই কঠোর রায় তাই শুধু একজন অপরাধীর শাস্তি নয়, বরং চিকিৎসা পেশার প্রতি মানুষের বিশ্বাস রক্ষার এক শক্ত বার্তা।

‘মৃত্যুর ডাক্তার’-এর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ফ্রান্সের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অধ্যায় হয়ে থাকবে। এই রায় হয়তো নিহতদের ফিরিয়ে আনবে না, কিন্তু ন্যায়বিচারের পথে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা ভবিষ্যতে এমন ভয়ংকর বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত