ডিএসইর প্রথম নারী এমডি হিসেবে নুজহাত আনোয়ারের ঐতিহাসিক নিয়োগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১৬ বার

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

ডিএসইর প্রথম নারী এমডি—এই বাক্যটি আজ বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে যুক্ত হলো। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নুজহাত আনোয়ারের নিয়োগ কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি নারী নেতৃত্ব, পুঁজিবাজার সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে এক নতুন প্রত্যাশার বার্তা বহন করছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আজ বৃহস্পতিবার তাঁর নিয়োগ অনুমোদন দেওয়ার মধ্য দিয়ে ডিএসইর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারীকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাল।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে শূন্য থাকা পূর্ণকালীন এমডি পদে নুজহাত আনোয়ারের নিয়োগ ডিএসইর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট মহলে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হয়েছে। কারণ, নুজহাত আনোয়ার শুধু একজন অভিজ্ঞ পেশাজীবীই নন, বরং আন্তর্জাতিক পরিসরে আর্থিক খাত ও উন্নয়ন অর্থায়নে তাঁর দীর্ঘ দুই দশকের কর্মজীবন তাঁকে এই দায়িত্বের জন্য আলাদা করে যোগ্য করে তুলেছে।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, নুজহাত আনোয়ার আর্থিক বাজার, ব্যাংকিং এবং উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে আসছেন। তাঁর কর্মজীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনে বা আইএফসিতে। সেখানে তিনি আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক দেশে নেতৃত্বস্থানীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। বতসোয়ানা ও নামিবিয়ায় আইএফসির কান্ট্রি অফিসার হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালন ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

আইএফসিতে কাজ করার সময় নুজহাত আনোয়ার গাবোরোনে আইএফসির কার্যক্রম প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বেই বতসোয়ানায় আইএফসির প্রথম বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হয়, যা সে দেশের বেসরকারি খাত উন্নয়নে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। একই সঙ্গে টেকসই বিনিয়োগ কর্মসূচি এগিয়ে নিতে তাঁর অবদান আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে কেবল একজন দক্ষ প্রশাসক নয়, বরং কৌশলগত চিন্তাবিদ হিসেবেও পরিচিত করেছে।

পুঁজি ব্যবস্থাপনা, ট্রেজারি ও তারল্য ব্যবস্থাপনা, লেনদেন সেবা, পোর্টফোলিও অপটিমাইজেশন এবং বাজার উন্নয়ন ও অ্যাডভোকেসির মতো জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নুজহাত আনোয়ারের দক্ষতা রয়েছে। এসব দক্ষতা এমন এক সময়ে ডিএসইর নেতৃত্বে আসছে, যখন বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নানা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাজারে আস্থা ফেরানো, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় করা এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজার কাঠামো উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো এখন ডিএসইর সামনে বড় দায়িত্ব।

নুজহাত আনোয়ারের কর্মজীবনের শুরুটা হয়েছিল দেশীয় ও বহুজাতিক ব্যাংকিং খাতে। সিটিব্যাংক বাংলাদেশ ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশে তিনি টানা ১৬ বছর বিভিন্ন জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপনা পদে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিনি করপোরেট ব্যাংকিং, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক সেবার আধুনিকীকরণে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে আরও সমৃদ্ধ করে।

শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকেও নুজহাত আনোয়ার সুপ্রতিষ্ঠিত। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যে, বিশেষত ফাইন্যান্স বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশের শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত এই একাডেমিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

নুজহাত আনোয়ারের নিয়োগ প্রসঙ্গে ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, গত এক বছরে নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটি এবং পরিচালনা পর্ষদ ডিএসইর জন্য একজন যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্ব খুঁজতে নিরলসভাবে কাজ করেছে। তাঁর ভাষায়, নুজহাত আনোয়ারের নেতৃত্বগুণ, দেশ-বিদেশে আর্থিক খাতের বিস্তৃত অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের পুঁজিবাজার রূপান্তরের প্রতি গভীর আগ্রহ রয়েছে। এসব গুণাবলি ডিএসইকে আগামী দিনে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে সহায়ক হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

চেয়ারম্যান আরও জানান, প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে নুজহাত আনোয়ারকে দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে। ডিএসইর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন পূর্ণকালীন এমডি না থাকায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা এই নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

উল্লেখযোগ্য যে, ডিএসইর এমডি পদটি গত কয়েক বছরে একাধিকবার শূন্য হয়েছে। ২০২২ সালের আগস্টে তৎকালীন এমডি তারিক আমিন ভূঁইয়া পদত্যাগ করার পর প্রায় এক বছর এই পদটি শূন্য ছিল। পরে ২০২৩ সালের আগস্টে বিএসইসির তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক এ টি এম তারিকুজ্জামান এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেন। কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাসে তিনি বিএসইসি কমিশনার হিসেবে যোগ দেওয়ার জন্য পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে ডিএসই পূর্ণকালীন এমডি ছাড়া ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনায় চলছিল।

এই প্রেক্ষাপটে নুজহাত আনোয়ারের নিয়োগ শুধু প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ফেরানোর বিষয় নয়, বরং এটি বাজার অংশগ্রহণকারীদের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত। বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, তাঁর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ডিএসইতে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও আস্থার নতুন পরিবেশ তৈরি হবে।

একই সঙ্গে ডিএসইর প্রথম নারী এমডি হিসেবে নুজহাত আনোয়ারের নিয়োগ নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও একটি শক্ত বার্তা বহন করে। বাংলাদেশের করপোরেট ও আর্থিক খাতে শীর্ষ নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত। এই নিয়োগ ভবিষ্যতে আরও বেশি যোগ্য নারী পেশাজীবীর জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত