প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
টিকটকের সঙ্গে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তি ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জনপ্রিয় শর্ট ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শো জি চিউ বৃহস্পতিবার কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া এক অভ্যন্তরীণ বার্তায় জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা পরিচালনা অব্যাহত রাখতে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বাজারগুলোর একটিতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে টিকটক। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি এই খবর জানিয়েছে।
টিকটকের এই চুক্তিকে অনেকেই ‘কৌশলগত সমঝোতা’ হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা টিকটকের মালিকানা প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সের সঙ্গে চীনা সরকারের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা তুলে ধরে টিকটকের ব্যবহারকারী তথ্য চীনা সরকারের হাতে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে নতুন যৌথ উদ্যোগ গঠনের মাধ্যমে টিকটক সেই উদ্বেগ অনেকটাই প্রশমিত করতে চেয়েছে।
এই চুক্তির আওতায় টিকটকের নতুন বিনিয়োগকারী হিসেবে থাকছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি জায়ান্ট ওরাকল, প্রাইভেট ইকুইটি প্রতিষ্ঠান সিলভার লেক এবং বিনিয়োগ সংস্থা এমজিএক্স। বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে ওরাকলের নাম, কারণ প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। বিশ্লেষকদের মতে, এই রাজনৈতিক সংযোগ টিকটকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
টিকটকের প্রধান নির্বাহী শো জি চিউ কর্মীদের জানান, প্রস্তাবিত জয়েন্ট ভেঞ্চারের মালিকানা কাঠামো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে তা যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান আইনি কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। চুক্তি অনুযায়ী, নতুন এই যৌথ উদ্যোগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মালিকানা থাকবে বাইটড্যান্সের বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের হাতে। বাইটড্যান্স নিজে ধরে রাখবে প্রায় ২০ শতাংশ শেয়ার, যা বর্তমান মার্কিন আইনে কোনো চীনা কোম্পানির জন্য সর্বোচ্চ অনুমোদিত সীমা। বাকি অংশ থাকবে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের নিয়ন্ত্রণে।
এই কাঠামোর মাধ্যমে টিকটক কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে আশ্বস্ত করতে চাইছে যে, অ্যাপটির যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কার্যক্রমে চীনা মালিকানার প্রভাব সীমিত থাকবে। একই সঙ্গে তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা মানদণ্ড মানা হবে—এমন প্রতিশ্রুতিও চুক্তির অংশ হিসেবে আলোচনায় এসেছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
টিকটককে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগকারী খুঁজে নেওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের আমলে বাইটড্যান্সকে নির্দেশ দেওয়া হয়, যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের কার্যক্রম বিক্রি করতে হবে অথবা একটি গ্রহণযোগ্য অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় অ্যাপটি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিষিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। এই নির্দেশনার পর টিকটককে জানুয়ারি পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল উপযুক্ত বিনিয়োগকারী খুঁজে বের করার জন্য। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই চুক্তি সম্পন্ন করায় বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সক্ষম হলো প্রতিষ্ঠানটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চুক্তি শুধু একটি করপোরেট সমঝোতা নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি দ্বন্দ্বের একটি প্রতীকী সমাধানও। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার জাতীয় নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান বজায় রাখছে, অন্যদিকে টিকটকের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করলে তা তরুণ ব্যবহারকারী ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারত। এই চুক্তির মাধ্যমে উভয় পক্ষই একটি মধ্যপন্থা খুঁজে পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
টিকটক বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে কোটি কোটি ব্যবহারকারীর একটি বিশাল বাজার ধরে রেখেছে। কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ছোট ব্যবসা ও বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে শুধু টিকটকই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হাজারো উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়ত। সে কারণে এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্যও স্বস্তিদায়ক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সমালোচকরাও কম নেই। অনেকেই বলছেন, মালিকানা কাঠামো বদলালেও বাইটড্যান্সের প্রভাব পুরোপুরি দূর হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও বড় করপোরেট স্বার্থের সমন্বয়ে এই চুক্তি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, টিকটকের এই সমঝোতা হয়তো সাময়িকভাবে সংকট কাটালেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তি ও তথ্য নিরাপত্তা নিয়ে টানাপোড়েন শেষ হয়নি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সুরক্ষা ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান এখনও অনেক দূরে। টিকটকের উদাহরণ দেখিয়ে অন্য আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও হয়তো নতুন কৌশল খুঁজবে নিজেদের বাজার টিকিয়ে রাখার জন্য।