প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য পত্রিকা অফিসে হামলার ঘটনা জাতির জন্য লজ্জাজনক ও গভীর উদ্বেগজনক—এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের দৃশ্য সারাবিশ্ব দেখেছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু দেশের ভাবমূর্তিকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং গণতন্ত্রের ভিত্তিকেও নড়বড়ে করে দেয়।
রোববার রাজধানীর হোটেল রেডিসন ব্লুতে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে বিএনপি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে আয়োজিত এ সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টেলিভিশন ও রেডিওর সম্পাদক, বার্তা প্রধান এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন। সভায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণমাধ্যমের নিরাপত্তা এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পত্রিকা অফিসে হামলার মতো ঘটনাকে শুধু দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শেষ করা যায় না। এখানে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সরকারের। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, হামলার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও তা কেন আমলে নেওয়া হয়নি। কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সময়মতো সাড়া দেয়নি। তার ভাষায়, আমরা শুনেছি হামলার পর এক-দুই ঘণ্টা দেরিতে বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। এই গাফিলতির দায় কে নেবে—এই প্রশ্ন আজ পুরো জাতির।
তিনি আরও বলেন, যাদের হাতে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব, তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। রাষ্ট্রব্যবস্থা কাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমকে চিহ্নিত করে একের পর এক হামলার ঘটনা নতুন নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। কিছু নির্দিষ্ট স্থানে ও ঠিকানায় ‘মবক্রেসি’ বা দলগত সহিংসতার সংস্কৃতি প্রশ্রয় পাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বিএনপির এ নেতা। তিনি বলেন, আমরা চেয়েছিলাম ডেমোক্রেসি, কিন্তু কেন মবক্রেসিকে লালন করা হবে। সরকারের দুর্বলতার কারণেই এসব ঘটনা ঘটছে এবং এগুলো কঠোর হাতে দমন করা জরুরি।
দেশের মানুষের গণপ্রত্যাশা ও গণআকাঙ্ক্ষা এখন অনেক উঁচুতে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের মানুষ পূর্ণ গণতন্ত্র চায়। গণতন্ত্রকে সব ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। এজন্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা ছাড়া বিকল্প নেই। এসব প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা গণতন্ত্রের প্রকৃত রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে। তা না হলে রাষ্ট্রের ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং ভবিষ্যতে আরও সংকট তৈরি হবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণমাধ্যমকে অনেকেই রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলে থাকেন। সাংবাদিকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে, তবে দেশের স্বার্থের প্রশ্নে সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। তিনি বলেন, নিরপেক্ষতার কথা বলা হলেও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দেশের পক্ষেই অবস্থান নেওয়া জরুরি। জনগণ যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়, তাহলে বিএনপি সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ফ্যাসিবাদী শক্তি কী করেছে, তা ভুলে গেলে চলবে না।
তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসন ও স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৮ বছর ধরে তিনি বাধ্য হয়ে কষ্টকর নির্বাসিত জীবন যাপন করেছেন। জনগণ আশা করছে, তারেক রহমানের দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের খুঁটি আরও শক্তিশালী হবে। বিএনপি এই প্রত্যাবর্তনকে গণতন্ত্র পুনর্গঠনের কাজে লাগাতে চায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
একই অনুষ্ঠানে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, শফিক রেহমানের মতো বর্ষীয়ান সাংবাদিকদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা ফ্যাসিবাদী শাসনেরই প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেন, সেই সময়টা ছিল ঘন কালো অন্ধকারের মতো। সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী—প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত হয়েছে। এখনো যেসব ঘটনা সামনে আসছে, তা আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। তিনি একজন তরুণ নেতার মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, কথার কারণে কাউকে জীবন দিতে হবে—এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
মতবিনিময় সভায় মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, অস্থির সময়ে সবাই অস্থির হয়ে পড়েছি। মিডিয়া পলিসি বাস্তবায়িত হলে গণমাধ্যম অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে। তিনি বলেন, তারেক রহমান এমন এক সময়ে দেশে ফিরছেন, যখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নিরাপত্তা। দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনারের বাসভবনে হামলার ঘটনাও উদ্বেগজনক। এসব পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন, ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর ওপর হামলার পর সামনে কী ঘটবে, তা কেউ জানে না। সবাই নিরাপদ থাকতে চায়, স্বাধীনভাবে লিখতে চায়। গণমাধ্যমকে কথা বলতে দিলে তারা সাধুবাদ জানাবে, আর বাধা দিলে সমালোচনা করবে—এটাই গণমাধ্যমের স্বাভাবিক ভূমিকা। সামনে যে চ্যালেঞ্জ আসছে, তা মোকাবিলায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

মতবিনিময় সভায় দেশের বিভিন্ন শীর্ষ গণমাধ্যমের সম্পাদক ও নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, আমার দেশ-এর নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ, দৈনিক খবরের কাগজের সম্পাদক মোস্তফা কামাল, কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ, যুগান্তরের সম্পাদক আব্দুল হাই শিকদার, নির্বাহী সম্পাদক এনাম আবেদীন, আজকের পত্রিকার সম্পাদক কামরুল হাসান, ইনকিলাব পত্রিকার সম্পাদক আ ক ম বাহাউদ্দীন, বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ আহমেদ পাভেলসহ দলটির শীর্ষ নেতারাও সভায় অংশ নেন। পুরো আয়োজনজুড়ে গণমাধ্যমের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্নটি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। বক্তারা মনে করেন, পত্রিকা অফিসে হামলার মতো ঘটনা কোনোভাবেই সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য নয়, এবং এসব ঘটনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়কেই সোচ্চার হতে হবে।