ফেরি দুর্ঘটনার পর ১৫ ঘণ্টা নীরবতা, ক্ষোভে ফুঁসছে জনপদ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৫ বার
ফেরি দুর্ঘটনার পর ১৫ ঘণ্টা নীরবতা, ক্ষোভে ফুঁসছে জনপদ

প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ধলেশ্বরী নদীতে ভয়াবহ ফেরি দুর্ঘটনার ১৫ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও উদ্ধার অভিযান শুরু না হওয়ায় চরম ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে স্থানীয়দের মধ্যে। শনিবার গভীর রাতে ফেরি থেকে ট্রাকসহ পাঁচটি যানবাহন নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় ইতোমধ্যে তিনজনের প্রাণহানি নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু সময় গড়ালেও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় নিখোঁজদের ভাগ্য কী, সে প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। একই সঙ্গে এই দুর্ঘটনা আবারও দেশের নৌ ও সড়ক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতা, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং জরুরি সাড়া ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নগ্নভাবে সামনে এনে দিয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ভাষ্যমতে, দুর্ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কথা থাকলেও সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে উদ্ধার অভিযান কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। রোববার বেলা ১১টার দিকে বিআইডব্লিউটিএর কয়েকজন কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও তাদের সঙ্গে কোনো উদ্ধার সরঞ্জাম বা ভারী যন্ত্রপাতি ছিল না। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ আরও তীব্র হয়। অনেকেই অভিযোগ করেন, শুধু পরিস্থিতি দেখতে এসে দায়িত্ব শেষ করা হলে মানুষের প্রাণহানির দায় কে নেবে—এই প্রশ্ন আজ সবার।

ধলেশ্বরী নদীর এই ফেরি ঘাট বক্তাবলী এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। প্রতিদিন এই ফেরি ব্যবহার করেই ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। দুর্ঘটনার পর ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বাজারে পণ্য সরবরাহ বন্ধ, ছোট ব্যবসায়ীরা দোকান খুলেও ক্রেতা পাচ্ছেন না, দিনমজুররা কাজের জায়গায় পৌঁছাতে পারছেন না। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একটি দুর্ঘটনার প্রভাব কীভাবে পুরো জনপদকে অচল করে দিতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ এখন বক্তাবলী।

বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জের সহকারী পরিচালক কামরুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, দুর্ঘটনাকবলিত ফেরিটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার রাতে দুর্ঘটনার পর থেকে এখনো পর্যন্ত ওই বিভাগের কোনো প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে আসেনি। ফলে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করতে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার সঠিক স্থান কেউ নির্দিষ্ট করে দেখাতে পারছে না। নদীর কোন অংশে যানবাহনগুলো তলিয়ে গেছে, সেটি নিশ্চিত না হয়ে উদ্ধার অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ। তাই প্রথমে নদীর গভীরতা ও স্রোতের অবস্থা নিরূপণ করা হচ্ছে। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তবে এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পরপরই যদি সমন্বিতভাবে কাজ শুরু হতো, তাহলে হয়তো আরও প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব ছিল। সময়মতো উদ্ধার তৎপরতা শুরু না হওয়ায় নদীর স্রোতে যানবাহন ও নিখোঁজদের আরও দূরে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। এলাকাবাসীর অনেকেই বলছেন, আমরা শুধু আশ্বাস চাই না, আমরা কাজ দেখতে চাই। প্রতিটি মিনিট এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

রোববার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ধলেশ্বরী নদীর পশ্চিম পাড়ে বক্তাবলী ঘাটে ফেরিটি নোঙর করে রাখা হয়েছে। উৎসুক জনতা ভিড় জমিয়েছে দুর্ঘটনাকবলিত ফেরিটি একনজর দেখার জন্য। নৌপুলিশের একটি দল নদীতে টহল দিচ্ছে, তবে উদ্ধার কার্যক্রমের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে স্বজন হারানো মানুষের কান্না আর অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস বাতাস ভারী করে তুলেছে।

এই দুর্ঘটনায় ইতোমধ্যে কোস্টগার্ড তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন মোটরসাইকেলচালক রফিক, ভ্যানচালক স্বাধীন এবং প্রবাসী মাসুদ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার সময় নদীতে প্রচণ্ড স্রোত ছিল। যানবাহনগুলো মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যায়, অনেকেই কিছু বুঝে ওঠার আগেই পানির নিচে চলে যায়। এখনও কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যদিও এ বিষয়ে কোনো সংস্থা আনুষ্ঠানিক সংখ্যা নিশ্চিত করেনি।

ফেরিতে থাকা এক যাত্রী জানান, শনিবার রাতে নারায়ণগঞ্জের নরসিংহপুর এলাকা থেকে ফেরিটি ছেড়ে আসে। যাত্রী ও যানবাহনে তখন ফেরিটি প্রায় পূর্ণ ছিল। মাঝনদীতে পৌঁছানোর পর হঠাৎ একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ধারণা করা হচ্ছে, ফেরির ভেতরে যানবাহনগুলো সঠিকভাবে স্থির করে না রাখার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাকটি সামনে থাকা একটি মোটরসাইকেল, দুটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এবং একটি ভ্যানগাড়িকে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেগুলো নদীতে পড়ে যায়। যাত্রীদের মধ্যে তখন হুড়োহুড়ি শুরু হয়, কেউ কেউ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বাঁচান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দুর্ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশের অনেক ফেরি ঘাটেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল, যানবাহন তোলার সময় নিয়ম মানা হয় না, অতিরিক্ত বোঝা নেওয়া হয় এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি থাকে না। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কাজে যে বিলম্ব দেখা যাচ্ছে, সেটিও দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যারই প্রতিফলন। একদিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএ—দায়িত্ব ভাগাভাগি থাকলেও বাস্তবে সমন্বয়ের অভাবেই বারবার প্রাণহানি ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে নিহতদের পরিবারগুলো চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। একজন নিহতের স্বজন বলেন, আমরা শুধু খবর পাচ্ছি, কিন্তু কোনো সংস্থা এসে আমাদের কিছু বলছে না। কে উদ্ধার করবে, কখন করবে—কেউ জানে না। এই অনিশ্চয়তা আমাদের আরও ভেঙে দিচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করার দাবি জানিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

ধলেশ্বরী নদীর এই ফেরি দুর্ঘটনা শুধু তিনটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, এটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও মানবিক দায়বদ্ধতা নিয়ে। উদ্ধার অভিযানের প্রতিটি বিলম্বিত ঘণ্টা মানুষের আস্থাকে আরও ক্ষয় করছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নেয় এবং এই দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে নিরাপদ নৌ ও সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে। স্থানীয়দের চোখ এখন নদীর দিকে, আর মন পড়ে আছে সেই প্রশ্নেই—আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত