প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ, সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকারের জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। রোববার দুপুর ২টার দিকে ঢাকার বিমান বাহিনী ঘাঁটি বাশারে, ন্যাশনাল প্যারেড গ্রাউন্ডে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই জানাজা অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তার অবদান গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগের সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
এর আগে শনিবার সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। তার প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক, সামরিক ও সামাজিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মহল থেকে শোকবার্তা জানানো হয় এবং তাকে জাতির এক গর্বিত সন্তান হিসেবে অভিহিত করা হয়।
জানাজা অনুষ্ঠানে বিমানবাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। সহযোদ্ধা, সাবেক সহকর্মী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষ নীরব শ্রদ্ধায় তাকে শেষ বিদায় জানান। অনেকের চোখে ছিল অশ্রু, কারণ এ কে খন্দকার শুধু একজন সামরিক কর্মকর্তা নন, তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত ইতিহাস।

এ কে খন্দকারের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে। ১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি পাইলট অফিসার হিসেবে কমিশন লাভ করেন। শুরুতে তিনি ফাইটার পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দ্রুতই তার দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের স্বীকৃতি পান। ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তিনি ফাইটার পাইলট হিসেবে কাজ করেন, এরপর ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর হিসেবে নতুন পাইলটদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নেন। তার প্রশিক্ষণ দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণ তাকে দ্রুতই উচ্চতর দায়িত্বে পৌঁছে দেয়।
পাকিস্তান এয়ার ফোর্স একাডেমিতে তিনি ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর স্কুলে ফ্লাইট কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করার চেষ্টা করেন। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্বে থেকে তিনি অসংখ্য দক্ষ পাইলট তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। এরপর জেট ফাইটার কনভারশন স্কোয়াড্রনে ফ্লাইট কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৬০ সাল পর্যন্ত, যেখানে জেট যুদ্ধবিমানের অপারেশন ও কৌশলগত প্রশিক্ষণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
১৯৬১ সালে তিনি স্কোয়াড্রন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন পাকিস্তান বিমানবাহিনী একাডেমিতে। এই দায়িত্বে থেকে তিনি শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী প্রশিক্ষণ কাঠামো গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি জেট ফাইটার কনভারশন স্কোয়াড্রনে স্কোয়াড্রন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর পর ট্রেনিং উইংয়ের অফিসার কমান্ডিং হিসেবে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি পিএএফ একাডেমিতে দায়িত্ব পালন করেন, যা তার সামরিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৬৯ সালের আগ পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্ল্যানিং বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি সামরিক পরিকল্পনা ও কৌশলগত উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। একই বছরে তিনি ঢাকায় অবস্থিত পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একটি ঘাঁটির সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই দায়িত্ব পালনকালে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা তিনি কাছ থেকে দেখেন, যা পরবর্তীতে তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এ কে খন্দকার বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধকালীন কৌশল নির্ধারণ, সামরিক সমন্বয় এবং মুক্তিবাহিনীর কার্যক্রম সংগঠিত করতে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তার নেতৃত্ব ও অভিজ্ঞতা মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে তোলে। স্বাধীনতার পর তিনি নবগঠিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পুনর্গঠন ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং পরবর্তীতে বিমানবাহিনী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সামরিক জীবনের বাইরে তিনি রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পরিসরেও সক্রিয় ছিলেন। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি স্পষ্টভাষী ও দায়িত্বশীল অবস্থান গ্রহণ করতেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তার বক্তব্য ছিল দৃঢ় ও আপসহীন। এই কারণেই তিনি বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছেন এবং প্রশংসা ও সমালোচনা—দুই-ই পেয়েছেন। তবে তার দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি নিষ্ঠা কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি।
তার জানাজা শেষে উপস্থিত অনেকেই বলেন, এ কে খন্দকারের মৃত্যুতে দেশ একজন অভিজ্ঞ সামরিক নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠককে হারাল। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়। একজন পেশাদার সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে যেমন তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন, তেমনি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি দেশকে স্বাধীন করার সংগ্রামে অবদান রেখেছেন। তার জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন এই জানাজা শুধু একজন ব্যক্তির বিদায় নয়, বরং একটি ইতিহাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। এ কে খন্দকারের প্রয়াণে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তার স্মৃতি, অবদান এবং আদর্শ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও সামরিক ইতিহাসে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।