রাবিতে ছয় ডিনের অফিসে তালা, উত্তাল ক্যাম্পাস রাজনীতি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৩ বার
রাবিতে ছয় ডিনের অফিসে তালা, উত্তাল ক্যাম্পাস রাজনীতি

প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ছয়জন আওয়ামীপন্থি ডিনের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে ক্যাম্পাসে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। রোববার দুপুরে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ডিনস কমপ্লেক্সে গিয়ে এসব কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এ সময় নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার বেলা ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা ডিনস কমপ্লেক্সে জড়ো হন। এরপর তারা একে একে ছয়টি ডিনের অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেন। এ সময় ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘আওয়ামী লীগের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘আওয়ামী লীগের ঠিকানা এই বাংলায় হবে না’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা। শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচিকে ঘিরে ডিনস কমপ্লেক্স ও আশপাশের এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যদিও বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

শিক্ষার্থীদের দাবি, যেসব ডিনের মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে, তারা নৈতিকভাবে আর ওই পদে থাকার অধিকার রাখেন না। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে প্রশাসনিক পদে বহাল থাকা জুলাই পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও তারা মনে করছেন। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই আন্দোলন কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে নয়; বরং তারা একটি নির্দলীয় ও গ্রহণযোগ্য প্রশাসনিক কাঠামো দেখতে চান।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত রাকসুর সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক জায়িদ হাসান জোহা সাংবাদিকদের বলেন, শিক্ষার্থীরা আর কোনোভাবেই পুরোনো রাজনৈতিক প্রভাবের পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না। তার মতে, জুলাইয়ের ঘটনার পর ক্যাম্পাসে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তা পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। তিনি বলেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কেউ যদি প্রশাসনিক পদ আঁকড়ে ধরে রাখেন, তাহলে তা নৈতিকতা ও ছাত্র-আন্দোলনের চেতনার পরিপন্থী।

এই আন্দোলনের পেছনের প্রেক্ষাপট আরও বিস্তৃত। গত ১৭ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়জন ডিনসহ মোট ১২ জন ডিনের মেয়াদ শেষ হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার এক বক্তব্যে জানান, সামনে ভর্তি পরীক্ষা থাকায় এই মুহূর্তে নতুন ডিন নির্বাচন দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি মন্তব্য করেন, এক বছর যেহেতু বর্তমান ডিনদের সঙ্গে কাজ করা হয়েছে, তাই আরও কিছুদিন রাখলেও বড় কোনো সমস্যা হবে না। এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরপরই শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।

রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার তখনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং বিভিন্ন বক্তব্যে ডিনদের পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেন। তার দাবি ছিল, মেয়াদ শেষ হওয়া ডিনদের অবিলম্বে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। অন্যথায় শিক্ষার্থীরা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবে। রোববারের তালা ঝুলানোর ঘটনা সেই ধারাবাহিক আন্দোলনেরই অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাবি সিনেট সদস্য আকিল বিন তালেব এই বিষয়ে বলেন, জুলাই পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসে যে পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে প্রশাসনের দৃশ্যমান উদ্যোগ শিক্ষার্থীরা দেখতে পায়নি। তিনি উল্লেখ করেন, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা সংকট, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং ছাত্রদের নিরাপত্তা নিয়ে একাধিকবার উদ্বেগ জানানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে জুলাইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রকাশ্য দিবালোকে একজন ছাত্রনেতাকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় শিক্ষার্থীরা গভীরভাবে মর্মাহত এবং এর সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত তারা শান্ত থাকতে পারছে না।

এই ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে এসেছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ দাবি করছেন, ক্যাম্পাসের সাম্প্রতিক সহিংসতার সঙ্গে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এবং অভিযুক্তরা দেশের বাইরে আশ্রয় পাচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, তালা ঝুলানোর ঘটনার দিন ছয়জন ডিনের কেউই নিজ নিজ কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না। রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট ডিনরা আগেই জানিয়ে দিয়েছেন যে তারা আপাতত দায়িত্বে থাকবেন না। তিনি আরও লেখেন, এখন দেখার বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এই পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নেন। তার মতে, বিচার ও নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এসব দপ্তর তালাবদ্ধ থাকাই কাম্য।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। ভর্তি পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকেও নজর রাখছে কর্তৃপক্ষ।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজও বিষয়টি নিয়ে বিভক্ত মত পোষণ করছেন। কেউ কেউ মনে করছেন, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে অস্থায়ীভাবে পুরোনো ডিনদের রাখা যেতে পারে। আবার অনেকে বলছেন, মেয়াদ শেষ হওয়া পদে কাউকে রাখার সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ও গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শিক্ষকদের একটি অংশ শিক্ষার্থীদের দাবিকে যৌক্তিক বলে মনে করলেও আন্দোলনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনেরই প্রতিফলন। ছাত্ররাজনীতি, প্রশাসনিক নিয়োগ এবং একাডেমিক স্বাধীনতা—এই তিনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে এমন সংকট বারবার ফিরে আসবে। তারা মনে করেন, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই পারে এমন পরিস্থিতি শান্ত করতে।

সব মিলিয়ে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় ডিনের অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা শুধু একটি তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ কর্মসূচি নয়; বরং এটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ছাত্ররাজনীতি ও নৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মহল কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করে এবং ক্যাম্পাসে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কোন দিকে মোড় নেয় এবং প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার ও দেশের শিক্ষাঙ্গন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত