পশ্চিম তীরে নতুন বসতি অনুমোদনে উত্তাল আন্তর্জাতিক অঙ্গন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৮ বার
পশ্চিম তীরে নতুন বসতি অনুমোদনে উত্তাল আন্তর্জাতিক অঙ্গন

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে আরও ১৯টি নতুন অবৈধ বসতি স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে ইসরাইলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে গত তিন বছরে ইসরাইলি সরকারের অনুমোদিত অবৈধ বসতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৬৯টিতে। রোববার ইসরাইল সরকারের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডসহ একাধিক গণমাধ্যম এ খবর প্রকাশ করেছে। নতুন এই অনুমোদনকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের কার্যালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘জুডিয়া ও সামেরিয়া’ নামে পরিচিত পশ্চিম তীর এলাকায় ১৯টি নতুন বসতি স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা। তবে ঠিক কোন তারিখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইসরাইল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের একাধিক প্রস্তাবের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা।

পশ্চিম তীর আন্তর্জাতিকভাবে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃত। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশের মতে, এই অঞ্চলে ইসরাইলের বসতি স্থাপন কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের পরিপন্থী। তবুও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইলি সরকার ধারাবাহিকভাবে নতুন বসতি অনুমোদন দিয়ে আসছে, যা ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে।

এই সিদ্ধান্তকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের ব্যক্তিগত অবস্থান। তিনি নিজেই একজন দখলদার বসতিস্থাপনকারী হিসেবে পরিচিত এবং পশ্চিম তীরের একটি বসতিতে বসবাস করেন। ফলে অনেকের মতে, তার নেতৃত্বে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সমালোচকরা বলছেন, একজন সক্রিয় বসতিস্থাপনকারী হিসেবে স্মোত্রিচের ভূমিকা এই নীতিগত সিদ্ধান্তকে আরও পক্ষপাতদুষ্ট করে তুলেছে।

ইসরাইল সরকারের এই ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। সৌদি আরব এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে দেশটি বলেছে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল এবং এটি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে এবং নতুন এই সিদ্ধান্ত সেই সম্ভাবনাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে বলে দেশটি মনে করছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও ইসরাইলের এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, পশ্চিম তীরে ইসরাইলের দখলদারিত্বমূলক কার্যক্রমের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনাকে আরও উসকে দিচ্ছে এবং প্রস্তাবিত স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলছে। গুতেরেস পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে বসতি স্থাপন অবৈধ এবং অবিলম্বে তা বন্ধ করা প্রয়োজন।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষও এই সিদ্ধান্তকে ‘উসকানিমূলক ও অবৈধ’ আখ্যা দিয়েছে। তাদের মতে, নতুন বসতি স্থাপনের অনুমোদন ফিলিস্তিনি জনগণের ভূমি ও অধিকারকে আরও সংকুচিত করবে। পশ্চিম তীরের বহু এলাকায় ইতোমধ্যেই ফিলিস্তিনিরা চলাচল, কৃষিকাজ ও দৈনন্দিন জীবনযাপনে নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়ছেন। নতুন বসতি স্থাপনের ফলে ভূমি দখল, চেকপোস্ট বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তাজনিত কড়াকড়ি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, বসতি সম্প্রসারণের ফলে ফিলিস্তিনি গ্রাম ও শহরগুলো খণ্ডিত হয়ে পড়ছে, যার ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে কিংবা তাদের কৃষিজমি ও সম্পদ ব্যবহারে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এসব ঘটনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট উদাহরণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইসরাইলের অভ্যন্তরেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। দেশটির একাংশ নাগরিক ও বিরোধী রাজনৈতিক দল মনে করছে, বসতি সম্প্রসারণের ফলে আন্তর্জাতিকভাবে ইসরাইল আরও একঘরে হয়ে পড়তে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ ইতোমধ্যেই বসতি নীতির বিরোধিতা করে আসছে। নতুন এই অনুমোদনের ফলে কূটনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ শুধু একটি ভূখণ্ডগত ইস্যু নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত একটি কাঠামো হলেও, বসতি সম্প্রসারণ সেই কাঠামোর বাস্তবায়নকে ক্রমেই দুরূহ করে তুলছে। নতুন বসতি মানে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড আরও খণ্ডিত হওয়া, যা একটি কার্যকর ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে ক্ষীণ করে দেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই সিদ্ধান্ত ঘিরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এই ধরনের সিদ্ধান্ত সহিংসতা বাড়াতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিম তীরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর জন্য ভবিষ্যৎ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।

সব মিলিয়ে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে আরও ১৯টি অবৈধ বসতি স্থাপনের অনুমোদন শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মানবাধিকার এবং আঞ্চলিক শান্তির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি ঘটনা। এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের অস্থিরতাকে আরও ঘনীভূত করবে কিনা, নাকি আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইসরাইল তার নীতি পুনর্বিবেচনা করবে—সেই প্রশ্নের উত্তর আপাতত অজানা। তবে এটুকু স্পষ্ট, পশ্চিম তীরকে ঘিরে উত্তেজনা আরও এক ধাপ বেড়ে গেল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত