প্রতিরক্ষা রপ্তানিতে তুরস্কের উল্লম্ফন, বললেন এরদোয়ান

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৯ বার
প্রতিরক্ষা রপ্তানিতে তুরস্কের উল্লম্ফন, বললেন এরদোয়ান

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে গতিতে এগিয়ে চলেছে, তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসেই দেশটির প্রতিরক্ষা ও বিমান খাতের রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪৪৫ বিলিয়ন ডলারে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। শনিবার এক নৌ প্ল্যাটফর্ম কমিশনিং অনুষ্ঠানে এই তথ্য তুলে ধরে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান বলেন, প্রতিরক্ষা শিল্পে এই প্রবৃদ্ধি কেবল অর্থনৈতিক অর্জন নয়, বরং তুরস্কের কৌশলগত সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতার প্রতিফলন।

এরদোয়ান তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, বর্তমানে তুরস্ক বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম প্রতিরক্ষা রপ্তানিকারক দেশ। এক সময় যে তুরস্ক প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য ব্যাপকভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল, আজ সেই দেশই আধুনিক অস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ, ড্রোন ও বিমান প্রযুক্তি রপ্তানির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে নিজের অবস্থান শক্ত করছে। তিনি বলেন, এই অর্জন হঠাৎ করে আসেনি; বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং দেশীয় প্রযুক্তির ওপর আস্থা রাখার ফলেই সম্ভব হয়েছে।

তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এরদোয়ান বলেন, এই খাতের প্রকল্পগুলো কেবল সরঞ্জাম উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তি উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, গবেষণা ও উন্নয়নকে শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য দেশকে প্রস্তুত করা। তার ভাষায়, প্রতিরক্ষা শিল্প মানে শুধু অস্ত্র তৈরি নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা।

বিশেষভাবে নৌবাহিনীর সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে এরদোয়ান বলেন, তুরস্ক বর্তমানে বিশ্বের হাতে গোনা ১০টি দেশের মধ্যে একটি, যারা নিজস্ব যুদ্ধজাহাজ নকশা, নির্মাণ এবং পরিচালনা করতে সক্ষম। তিনি জানান, দেশটির জন্য ৩০০ মিটার দীর্ঘ একটি বিমানবাহী রণতরী নির্মাণের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তুরস্কের নৌক্ষমতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমুদ্রে দেশটির উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হবে।

এরদোয়ান আরও বলেন, তুরস্কের প্রতিরক্ষা কৌশল কেবল স্থল বা আকাশে সীমাবদ্ধ নয়। স্থল, সমুদ্র, আকাশ ও সাইবারস্পেস—সব ক্ষেত্রেই প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একাধিক নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পে গবেষণা ও উন্নয়ন থেকে শুরু করে উৎপাদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দেশীয় ও জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। তার মতে, এই আত্মনির্ভরতা শুধু নিরাপত্তা নয়, বরং অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করছে।

তুরস্কের প্রতিরক্ষা রপ্তানির এই উল্লম্ফন আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রভাব ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তুরস্কের তৈরি ড্রোন, সাঁজোয়া যান, নৌযান ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিশেষ করে তুর্কি ড্রোন প্রযুক্তি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকারিতার কারণে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রতিযোগিতামূলক দাম, তুলনামূলক সহজ রক্ষণাবেক্ষণ এবং কার্যকর পারফরম্যান্সের কারণে তুরস্কের প্রতিরক্ষা পণ্যগুলো বিশ্ববাজারে দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে।

তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কিছু সমালোচনাও রয়েছে। একাধিক মানবাধিকার সংগঠন ও পশ্চিমা দেশের একটি অংশ মনে করে, প্রতিরক্ষা রপ্তানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্র ব্যবহারের নৈতিক প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এরদোয়ান এ প্রসঙ্গে বলেন, তুরস্ক দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালা মেনে প্রতিরক্ষা রপ্তানি করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তুরস্কের সামরিক খাতে বিনিয়োগ যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য নয়, বরং শান্তি, স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য।

এরদোয়ানের এই বক্তব্য তুরস্কের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অবস্থানকেই তুলে ধরে। তিনি বারবার বলেছেন, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ছাড়া কোনো দেশই প্রকৃত অর্থে স্বাধীন থাকতে পারে না। তার মতে, আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা শিল্প তুরস্ককে কেবল সামরিকভাবে নয়, কূটনৈতিকভাবেও শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। কারণ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়লে আন্তর্জাতিক আলোচনায় দেশের দরকষাকষির শক্তিও বৃদ্ধি পায়।

তুরস্কের অভ্যন্তরেও প্রতিরক্ষা শিল্পের এই অগ্রগতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। একদিকে এটি জাতীয় গর্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনীতিতে এর অবদানও গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগের ফলে দেশটিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, প্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে উঠছে এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিস্তৃত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই খাত ভবিষ্যতে তুরস্কের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।

আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও তুরস্কের প্রতিরক্ষা শক্তি গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণ সাগর অঞ্চলে নানা ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে দেশটি। এসব পরিস্থিতিতে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা তুরস্ককে কৌশলগত স্বাধীনতা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিদেশি অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমলে রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করাও সহজ হয়।

সব মিলিয়ে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা ও বিমান রপ্তানিতে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি শুধু একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়। এটি দেশটির দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান প্রভাবের একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বক্তব্য অনুযায়ী, এই অগ্রযাত্রা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে এবং তুরস্ক ধীরে ধীরে বিশ্ব প্রতিরক্ষা শিল্পে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করবে। এই পথচলায় তুরস্ক নিজেকে কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাজারের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়—এটাই এখন স্পষ্ট।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত