রেকর্ড ব্যবধানে জয়ে সিরিজ নিশ্চিত নিউজিল্যান্ডের

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬০ বার
রেকর্ড ব্যবধানে জয়ে সিরিজ নিশ্চিত নিউজিল্যান্ডের

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টের শেষ দিনে ক্রিকেটপ্রেমীরা দেখলেন আধিপত্যের এক নির্মম প্রদর্শনী। বিশাল লক্ষ্য, ভেঙে পড়া ব্যাটিং লাইনআপ আর ধারালো বোলিংয়ের সামনে দাঁড়াতে না পেরে রেকর্ড ব্যবধানে পরাজয় বরণ করল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আর সেই জয়ের মধ্য দিয়ে শুধু একটি টেস্ট বা একটি সিরিজই নয়, নিজেদের শক্তির বার্তাও স্পষ্ট করে দিল নিউজিল্যান্ড। ৩২৩ রানের বিশাল জয় কিউইদের ইতিহাসে যেমন বিশেষ স্থান করে নিল, তেমনি ক্যারিবীয়দের জন্য হয়ে থাকল হতাশার আরেকটি অধ্যায়।

টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে লক্ষ্য ছিল অবিশ্বাস্য ৪৬২ রান। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন লক্ষ্য তাড়া করে জেতা যে কতটা দুরূহ, তা ক্রিকেট অনুরাগীদের অজানা নয়। শেষ দিনের শুরুতেই পাঁচ উইকেট হারিয়ে ফেলা দলটির জন্য সেই অসম্ভব চ্যালেঞ্জ আরও দ্রুত অসম্ভব হয়ে ওঠে। মাত্র ১১ রানের ব্যবধানে পাঁচ উইকেট হারিয়ে ধসে পড়ে ক্যারিবীয় ব্যাটিং। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় ইনিংসে তারা গুটিয়ে যায় মাত্র ১৩৮ রানে, আর তাতেই নিউজিল্যান্ড নিশ্চিত করে ৩২৩ রানের রেকর্ড জয়।

এই জয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে রানের হিসেবে নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় টেস্ট জয়। এর আগে ২০১৭ সালে হ্যামিল্টনে ২৪০ রানের জয়ে নিজেদের সেরা রেকর্ড গড়েছিল কিউইরা। মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে সেই রেকর্ড ভেঙে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল তারা। শুধু ম্যাচ জয় নয়, এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজও ২-০ ব্যবধানে নিজেদের করে নিয়েছে নিউজিল্যান্ড। ড্র হওয়া প্রথম টেস্টের পর দ্বিতীয় ও তৃতীয় টেস্টে দাপট দেখিয়ে ক্যারিবীয়দের কোনো সুযোগই দেয়নি স্বাগতিকরা।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুটা অবশ্য খুব একটা খারাপ ছিল না। ওপেনার জন ক্যাম্পবেল ও ব্রেন্ডন কিং কিছুটা দৃঢ়তা দেখানোর চেষ্টা করেন। প্রথম দিনের শেষ বিকেলে ১৬ ওভারে ৪৩ রান তুলে দিন শেষ করেছিলেন তারা। শেষ দিনের শুরুতেও এই জুটি কিছুটা আশা জাগিয়েছিল। ৮৭ রানে ভাঙে এই উদ্বোধনী জুটি। ৯৬ বলে ৬৭ রান করা ব্রেন্ডন কিং আউট হন জ্যাকব ডাফির বলে। এরপর ক্যাম্পবেলকেও ফেরান এজাজ প্যাটেল। এই দুই উইকেটের পতনের পরই যেন পুরো ব্যাটিং লাইনআপ ভেঙে পড়ে।

বিনা উইকেটে ৮৭ রান থেকে মাত্র ১০ ওভারের মধ্যে স্কোর দাঁড়ায় ৯৮/৫। এই ধসই কার্যত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। নিউজিল্যান্ডের পেস ও স্পিন আক্রমণের সামনে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি ক্যারিবীয় ব্যাটাররা। দ্বিতীয় সেশনে কিছুটা মন্থর ব্যাটিং করে সময় নষ্ট করার চেষ্টা হলেও তা ম্যাচ বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় সেশনের মাঝামাঝি সময়েই ডাফি শেষ দুটি উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচের ইতি টানেন।

এই ম্যাচে জ্যাকব ডাফির পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেটসহ ম্যাচে মোট নয় উইকেট নেন ৩১ বছর বয়সী এই পেসার। এর ফলে সিরিজে তৃতীয়বারের মতো পাঁচ উইকেট শিকারের কৃতিত্ব দেখালেন তিনি। তিন ম্যাচের সিরিজে মোট ২৩ উইকেট নিয়ে ডাফি হন সিরিজসেরা। নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে এক টেস্ট সিরিজে এর চেয়ে বেশি উইকেট নিতে পেরেছেন কেবল দুজন—কিংবদন্তি রিচার্ড হ্যাডলি, যিনি এক সিরিজে ৩৩ উইকেট নিয়েছিলেন, এবং ব্রুস টেলর, যার সংগ্রহ ছিল ২৭ উইকেট। এই তালিকায় নিজের নাম যুক্ত করে ডাফি যে কতটা বড় কীর্তি গড়েছেন, তা সহজেই অনুমেয়।

ডাফির পাশাপাশি নিউজিল্যান্ডের সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখেন ব্যাটাররাও। প্রথম ইনিংসে ৫৭৫ রান করে ইনিংস ঘোষণা করে তারা ম্যাচের ভিত গড়ে দেয়। দ্বিতীয় ইনিংসেও দ্রুত রান তুলে ৩০৬/২ এ ইনিংস ঘোষণা করে কিউইরা প্রতিপক্ষকে মানসিক চাপে ফেলে দেয়। ডেভন কনওয়ে দুই ইনিংসেই ছিলেন দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী। তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই তাকে এনে দেয় ম্যাচসেরার পুরস্কার।

এই সিরিজ জয় নিউজিল্যান্ডের সাম্প্রতিক সময়ের সামগ্রিক আধিপত্যেরই প্রতিফলন। টেস্ট সিরিজের আগে পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ তারা জিতেছিল ৩-১ ব্যবধানে। এরপর তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করে ৩-০ ব্যবধানে জয় পায় কিউইরা। সব মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ সফরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য এটি ছিল একেবারেই হতাশাজনক। পরিসংখ্যান বলছে, ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে নিউজিল্যান্ড তাদের সর্বশেষ পাঁচটি টেস্ট সিরিজেই জয় পেয়েছে। সর্বশেষ ২০১২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে টেস্ট সিরিজ হেরেছিল কিউইরা।

অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য এই পরাজয় নতুন করে প্রশ্ন তুলছে তাদের টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে। এক সময়ের ভয়ংকর ক্যারিবীয় দল এখন ধারাবাহিকভাবে বড় ব্যবধানে হারছে। ব্যাটিং লাইনআপের ভঙ্গুরতা, অভিজ্ঞতার অভাব এবং চাপ সামলাতে না পারার প্রবণতা আবারও স্পষ্ট হলো এই ম্যাচে। বিশেষ করে দ্বিতীয় ইনিংসে ৮৭/০ থেকে ৯৮/৫ হয়ে যাওয়ার ধস অনেকদিন স্মরণে থাকবে নেতিবাচক উদাহরণ হিসেবে।

মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্ট তাই শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, বরং দুই দলের বর্তমান অবস্থানের স্পষ্ট চিত্র। নিউজিল্যান্ড দেখাল তারা কেন ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের শক্তিশালী টেস্ট দলগুলোর একটি। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য এটি আত্মসমালোচনার সময়, যেখানে নিজেদের কাঠামো, খেলোয়াড় গঠন ও মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হলো।

সংক্ষিপ্ত স্কোরে নিউজিল্যান্ডের দুই ইনিংসে ৫৭৫/৮ ও ৩০৬/২ ডিক্লেয়ার্ডের বিপরীতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ করে ৪২০ ও ১৩৮। ফলাফল হিসেবে ৩২৩ রানের বিশাল জয় নিয়ে সিরিজ শেষ করে স্বাগতিকরা। এই জয় কেবল রেকর্ড বইয়ে জায়গা করে নেয়নি, বরং কিউই ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে, যা ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর আগে তাদের জন্য বড় শক্তি হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত