মার্ক কার্নির উত্থান ও বাংলাদেশের রাজনীতির আত্মজিজ্ঞাসা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৫ বার
মার্ক কার্নির উত্থান ও বাংলাদেশের রাজনীতির আত্মজিজ্ঞাসা

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সংসদীয় গণতন্ত্রে দলই সাধারণত মুখ্য শক্তি, ব্যক্তি সেখানে গৌণ উপাদান—এটাই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক তত্ত্ব ও চর্চার স্বীকৃত বাস্তবতা। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, কিছু বিশেষ সময় আসে, যখন কোনো ব্যক্তি তার ব্যক্তিত্ব, দক্ষতা, নৈতিক দৃঢ়তা ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার মাধ্যমে দলীয় সীমানা অতিক্রম করে জনআস্থার কেন্দ্রে উঠে আসেন। তখন তিনি আর কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি থাকেন না; বরং হয়ে ওঠেন পরিবর্তনের প্রতীক, রাষ্ট্রীয় আস্থার বাহক এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তরের অনুঘটক। সাম্প্রতিক সময়ে কানাডার রাজনীতিতে মার্ক কার্নির উত্থান ঠিক এমনই একটি ঘটনা, যার তাৎপর্য কেবল কানাডার ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশের মতো দীর্ঘদিন রাজনৈতিক সংকটে আবদ্ধ রাষ্ট্রের জন্যও এটি গভীর চিন্তার খোরাক জোগায়।

মার্ক কার্নি প্রচলিত অর্থে কোনো রাজনীতিক নন। রাজনীতিতে প্রবেশের আগে তার পরিচয় ছিল একজন আন্তর্জাতিক মানের অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারক হিসেবে। বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের মতো জটিল সময়ে ব্যাংক অব কানাডার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তী সময়ে একমাত্র বিদেশি নাগরিক হিসেবে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর হওয়া—এই দুই অভিজ্ঞতাই তাকে রাজনীতির বাইরের এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যায়। সেখানে তার নেতৃত্বের মূল ভিত্তি ছিল প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক আস্থা, সিদ্ধান্তে সংযম, তথ্যনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রতি প্রতিশ্রুতি। জনপ্রিয় স্লোগান কিংবা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভের বদলে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন দায়িত্বশীলতার ওপর, যা তাকে প্রচলিত রাজনীতির ভিড় থেকে আলাদা করেছে।

এই প্রেক্ষাপটেই কানাডার ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টির রাজনৈতিক সংকটকে দেখতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, আকস্মিকভাবে আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, অভিবাসন ও জলবায়ু নীতিকে ঘিরে বিতর্ক—সব মিলিয়ে লিবারেল পার্টির ওপর জনআস্থার চাপ ক্রমাগত বাড়ছিল। দীর্ঘদিনের নেতৃত্বে থাকা জাস্টিন ট্রুডোর সরে দাঁড়ানো ছিল তাই শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি ছিল রাজনৈতিকভাবে নতুন করে বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা। এই সন্ধিক্ষণে মার্ক কার্নির নেতৃত্বে দলের হাল ধরা লিবারেল পার্টির জন্য একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত হয়ে ওঠে।

কার্নির প্রতি জনসমর্থনের ধরন লক্ষ্য করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, দল হিসেবে লিবারেল পার্টির জনপ্রিয়তার চেয়ে কার্নির ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অর্থাৎ বহু মানুষ তাকে দলীয় পরিচয়ের বাইরে একজন দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেখছেন। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের একটি অংশের ফ্লোর ক্রসিং করে লিবারেল শিবিরে যোগ দেওয়া এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। রাজনীতিতে এটি একটি বিরল বার্তা দেয়—যোগ্য নেতৃত্ব কখনো কখনো দলীয় আনুগত্যের কঠিন দেয়ালও ভেঙে দিতে পারে।

এই জায়গা থেকেই নেতৃত্বের গুণগত মানের প্রশ্নটি সামনে আসে। যখন কোনো নেতা ব্যক্তিগত সততা, পেশাদার দক্ষতা, দায়িত্ববোধ এবং নৈতিক অবস্থানকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখেন, তখন তার প্রভাব কেবল তার নিজের জনপ্রিয়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই প্রভাব ধীরে ধীরে দলীয় কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে। নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া, নীতিনির্ধারণের ধরন, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা—সব ক্ষেত্রেই তার প্রতিফলন দেখা যায়। এতে দল নিজেই এক ধরনের নৈতিক মানদণ্ড তৈরি করে, যেখানে যোগ্যতা ও সততা আকর্ষণের মূল শক্তি হয়ে ওঠে। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রক্রিয়াই রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত শক্ত করে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা আরও গভীর। এখানে দলীয় রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলেও সেই ব্যক্তি অধিকাংশ ক্ষেত্রে দলীয় কাঠামোর ঊর্ধ্বে উঠে নৈতিক নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেননি। বরং দল ও ব্যক্তির সম্পর্ক প্রায়ই এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যেখানে আনুগত্য যোগ্যতার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে নেতৃত্বের গুণগত পরিবর্তনের বদলে একই ধরনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটে। এই বাস্তবতায় অনেক ভোটারই দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ব্যক্তির ভাষা, আচরণ ও নৈতিক অবস্থান খোঁজেন, কিন্তু সেই প্রত্যাশা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ সীমিত থাকে।

দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বহু কর্মী ও বিশ্লেষকের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, বাংলাদেশে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এখনও রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারেনি। নীতিগত বিরোধিতা অনেক সময় ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপ নেয়। রাজনৈতিক ভাষা ক্রমশ কঠোর ও বিদ্বেষপূর্ণ হয়ে উঠছে, যা গণতান্ত্রিক চর্চাকে দুর্বল করে। ক্ষমতার ব্যবহারে দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহির অভাব রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের চোখে অনাস্থার জায়গায় নিয়ে গেছে।

এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন রাজনৈতিক সময়পর্ব বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভাব্য জাতীয় নেতৃত্বে যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে, তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—তারা কি কেবল প্রচলিত দলীয় রাজনীতির ধারাই অনুসরণ করবেন, নাকি নেতৃত্বের গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করবেন। এই প্রশ্ন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং তাদের রাজনৈতিক আচরণ, সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং দল পরিচালনার নীতিকে ঘিরে।

এখানে সাধারণ জনগণের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রে নেতৃত্ব কেবল ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো বিষয় নয়। সচেতন ভোটার, বিশেষ করে তরুণ ও ফ্লোটিং ভোটারদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বের ওপর চাপ তৈরি করে। তারা যখন নৈতিকতা, যোগ্যতা ও দায়িত্বশীলতাকে প্রাধান্য দেন, তখন রাজনৈতিক দলগুলোও বাধ্য হয় নিজেদের ভেতরে পরিবর্তন আনতে। শ্রমজীবী মানুষ, মধ্যবিত্ত ও নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক সচেতনতা এই পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে।

মার্ক কার্নির অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাজনীতি অনিবার্যভাবে স্থবির নয়। নেতৃত্ব যদি দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, নৈতিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকে গুরুত্ব দেয়, তবে দলকেও পরিবর্তিত হতে হয়। এই পরিবর্তন তাৎক্ষণিক নাও হতে পারে, কিন্তু তার প্রভাব গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে এই প্রশ্নের উত্তরে—দেশটি কি কেবল ক্ষমতার ধারাবাহিকতা আর পুরোনো অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি দেখবে, নাকি নেতৃত্বের গুণগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে একটি পরিণত, দায়িত্বশীল ও মানবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পথে এগিয়ে যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত