চাঁদা না পেয়ে গভীর রাতে ককটেল বিস্ফোরণে আতঙ্ক শরীয়তপুরে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫২ বার
চাঁদা না পেয়ে গভীর রাতে ককটেল বিস্ফোরণে আতঙ্ক শরীয়তপুরে

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শরীয়তপুর সদর উপজেলার শৌলপাড়া ইউনিয়নের গয়ঘর খলিফা কান্দি এলাকায় গভীর রাতে ককটেল বিস্ফোরণ, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ৩০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে একটি প্রতিপক্ষ পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালিয়েছে। ঘটনার পর ভুক্তভোগী পরিবার থানায় মামলা দায়ের করলে বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ঘটনাটি শুধু একটি পারিবারিক বা জমি সংক্রান্ত বিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং গ্রামীণ জনপদে চাঁদাবাজি, ক্ষমতার দাপট ও নিরাপত্তাহীনতার একটি বড় চিত্র তুলে ধরছে।

মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার ২০ ডিসেম্বর গভীর রাতে আনুমানিক আড়াইটার দিকে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র ও ককটেল নিয়ে আলাউদ্দিন বেপারীর বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়। গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে একের পর এক বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। হামলাকারীরা বাড়ির উঠোনে একাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এরপর তারা একটি টিনের ঘর, ‘আরিশ এগ্রো’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড এবং অন্যান্য স্থাপনা রামদা, ছ্যানদা, লোহার রড ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ভাঙচুর করে। অভিযোগ রয়েছে, তারা চারটি ফলগাছ কেটে ফেলে, যা পরিবারটির জীবিকা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল।

ঘটনার সময় বাড়ির সদস্যরা ঘুমিয়ে ছিলেন। ভুক্তভোগী আলাউদ্দিন বেপারীর মেয়ে সাদিয়া ইসলাম এনি জানান, রাত আড়াইটার দিকে তিনি ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হলে উঠোনে পরিচিত কয়েকজনকে স্পষ্ট দেখতে পান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে ককটেল নিক্ষেপ করে এবং ধারালো অস্ত্র নিয়ে ভাঙচুরে মেতে ওঠে। তিনি চিৎকার শুরু করলে পরিবারের অন্য সদস্যরা বেরিয়ে আসেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বুঝে দ্রুত ৯৯৯ নম্বরে ফোন দেওয়া হয়। কিছু সময়ের মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও ততক্ষণে হামলাকারীরা এলাকা ত্যাগ করে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল খালেক হাওলাদার বলেন, গভীর রাতে বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। প্রথমে অনেকে ভেবেছিলেন গ্যাস সিলিন্ডার বা বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। পরে জানতে পারেন, আলাউদ্দিন বেপারীর বাড়িতে ককটেল বিস্ফোরণ হয়েছে। রাতের অন্ধকারে মানুষজন ঘর থেকে বের হতে সাহস পাননি। এলাকায় দীর্ঘ সময় আতঙ্ক বিরাজ করে।

ভুক্তভোগী আলাউদ্দিন বেপারী অভিযোগ করেন, সম্প্রতি তিনি নিজের জমিতে পেঁপে বাগান ও একটি ফার্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। সেই উদ্দেশ্যে মাটি ভরাটের কাজ চলছিল। এ সময় স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি তার কাছে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। তিনি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে প্রথমে তার এক শ্রমিককে মারধর করা হয়। এরপরই গভীর রাতে এই হামলা চালানো হয়। আলাউদ্দিন বেপারী বলেন, হামলার পরও তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। পরিবার নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটছে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও পাঁচ থেকে সাতজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছে। মামলায় যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তারা সবাই স্থানীয়ভাবে পরিচিত ব্যক্তি। তবে ঘটনার পর থেকে অভিযুক্তদের অনেকের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। অভিযুক্তদের পরিবারের পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগও উঠেছে। বিল্লাল হাওলাদারের বোন নাছিমা বেগম দাবি করেন, জমি নিয়ে তাদের সঙ্গে আলাউদ্দিন বেপারীর দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, জমির সীমানা নির্ধারণ ও মাপঝোক ছাড়া ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে নিষেধ করায় বিরোধের সৃষ্টি হয়। তাদের দাবি, প্রতিপক্ষ নিজেরাই ঘটনা সাজিয়ে এখন তাদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।

পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ আলম জানান, ঘটনাস্থল থেকে ককটেল সদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের তথ্যও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা গ্রহণ করা হয়েছে এবং তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এলাকায় টহল জোরদার করেছে।

এই ঘটনার পর থেকে পুরো গয়ঘর খলিফা কান্দি এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। অনেক পরিবার রাতের বেলা বাড়ির বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল মনে করছেন, এমন সহিংস ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। তারা দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের গ্রামীণ বাস্তবতায় চাঁদাবাজি ও জমি বিরোধকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা নতুন নয়। তবে গভীর রাতে ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের সচেতন অংশের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই ধরনের অপরাধ রোধ করা কঠিন।

শরীয়তপুরের এই ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিল, গ্রামীণ উন্নয়ন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ অনেক সময় প্রভাবশালী চক্রের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে কীভাবে সহিংসতার জন্ম নেয়। আলাউদ্দিন বেপারীর মতো একজন সাধারণ উদ্যোক্তার স্বপ্ন ও নিরাপত্তা যখন রাতের আঁধারে বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে, তখন প্রশ্ন উঠে—আইনের সুশাসন ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সমাজ কতটা প্রস্তুত। স্থানীয়রা আশা করছেন, এই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার শুধু ভুক্তভোগী পরিবারকে ন্যায়বিচার দেবে না, বরং ভবিষ্যতে এমন সহিংসতা প্রতিরোধে একটি শক্ত বার্তাও দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত