প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলায় গ্রেপ্তার ৯, নিরাপত্তা জোরদার

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫৩ বার
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলায় গ্রেপ্তার ৯, নিরাপত্তা জোরদার

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারসহ দুটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ে হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সোমবার সকাল পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোট ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এই ঘটনা দেশের সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ জনগণের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা ও পুলিশি সূত্র মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, এই হামলা কেবল এক ধরনের দমননীতি বা প্রকাশ্য হুমকি নয়, বরং গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে সাতজনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। তারা হলেন—মো. কাশেম ফারুক, মো. সাইদুর রহমান, রাকিব হোসেন, মো. নাইম, ফয়সাল আহমেদ প্রান্ত, মো. সোহেল রানা এবং মো. শফিকুল ইসলাম। এছাড়া পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট এবং গোয়েন্দা পুলিশ আরও দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের পরিচয় যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মোট ৩১ জনকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে, যারা সাম্প্রতিক হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহ রয়েছে।

চট্টগ্রামে ভারতের সহকারী হাইকমিশনারের বাসভবনের নিকট বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করার ঘটনায় তিনজনকে ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করা ও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। এটি দেশের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কাশেম ফারুক বগুড়ার আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া কাসেমুল উলুম মাদ্রাসার প্রাক্তন ছাত্র এবং ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা। মো. সাইদুর রহমান ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার নোয়াকান্দা গ্রামের বাসিন্দা। শেরপুর জেলার রাকিব হোসেন প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এর কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার জন্য ভিডিও ফুটেজে শনাক্ত হয়েছেন। তার ফেসবুক আইডি থেকে ধ্বংসস্তূপের ছবি পোস্ট করা হয় এবং উসকানিমূলক বক্তব্যও প্রদান করা হয়।

ঢাকার তেজগাঁওয়ের কুনিপাড়া এলাকার মো. নাইমকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ঘটনায় লুট হওয়া ৫০,০০০ টাকাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেছেন, তিনি মোট ১,২৩,০০০ টাকা লুট করেছেন। লুটকৃত টাকার মাধ্যমে তিনি মোহাম্মদপুর থেকে একটি টিভি ও একটি ফ্রিজ কিনেছিলেন, যা পুলিশ উদ্ধার করেছে।

ঢাকার কারওয়ান বাজার রেললাইন এলাকা থেকে গ্রেপ্তারকৃত মো. সোহেল রানার বিরুদ্ধে মাদকসহ অন্যান্য আইনে ঢাকার বিভিন্ন থানায় ১৩টি মামলা রয়েছে। একই এলাকা থেকে গ্রেপ্তারকৃত মো. শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অতীতে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুটি মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত অন্যান্যদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এবং পুলিশ আশা করছে, তাদের থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এই হামলার পেছনে রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য রয়েছে। হামলাকারীরা মূলত সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের সহিংসতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সুশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গ্রেপ্তারকৃতদের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা হচ্ছে যাতে অন্যদেরকে দমন বা হুমকি প্রদানের কোনো সুযোগ না থাকে।

এদিকে, দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিক সংগঠন এ ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারের দাবি জানিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এই হামলার ফলে এলাকার মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বৃদ্ধি পেয়েছে। কেউ রাতে বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন, কেউ আবার শিশুরা স্কুলে যেতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়েছে।

এই ঘটনার গুরুত্ব আরেকটু বেড়ে যায় কারণ এটি শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা নয়, বরং দেশের গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যক্রমকে লক্ষ্যবস্তু করে পরিচালিত হয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও সমাজতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের ঘটনা যদি দ্রুতভাবে প্রতিরোধ না করা হয়, তবে তা সমাজে আতঙ্ক ও ভীতি ছড়িয়ে দেবে, যা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও ন্যায়বিচারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশ আশা করছে, গ্রেপ্তারকৃতদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের মাধ্যমে পুরো পরিকল্পনার চক্র এবং মূল সৃজনকারীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যেই তদন্তে অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন, হামলার সঙ্গে জড়িত আরও কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলমান রয়েছে।

এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে নাগরিকদের সচেতনতা, সামাজিক সংহতি এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্রুত এবং সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না নিলে এই ধরনের সহিংসতা পুনরায় ঘটার ঝুঁকি থাকবে। তাই সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।

শরীয়তপুর ও ঢাকার এই হামলার ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজে প্রগতিশীল চেতনা রক্ষার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের সহিংসতা সমাজকে বিভক্ত করতে পারে এবং নাগরিক জীবনের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তাই এটি শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নয়, পুরো দেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

এই ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত ৯ জনের কার্যক্রম, তাদের উদ্দেশ্য এবং হামলার পেছনের পরিকল্পনা সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে জনগণ আশা করছে, দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচারের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি দেওয়া হবে। এটি কেবল বিচার নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক স্বাধীনতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত