নাহিদ হাসনাতসহ জুনায়েদ-হাদির পরিবারের গানম্যান নিশ্চিত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬০ বার
নাহিদ হাসনাতসহ জুনায়েদ-হাদির পরিবারের গানম্যান নিশ্চিত

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তার উদ্বেগ দিনদিন তীব্র হচ্ছে। গত বছরের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলনের পর থেকে রাজপথ ও কলমের মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব, নাগরিক অধিকার এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে যারা সোচ্চার হয়েছেন, তাদের ওপর নানা হুমকির ছায়া ঘনীভূত হচ্ছে। বিশেষ করে ভারতের একপক্ষীয় নীতি এবং আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান গ্রহণকারী ব্যক্তিদের জন্য এটি এক নতুন ধরনের ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো মনে করাচ্ছে যে, রাজপথে এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রকাশ্যভাবে ক্ষমতার, প্রভাবশালী এবং সমালোচনামূলক বক্তব্য রাখার জন্য কিছু মানুষ বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন।

এই প্রেক্ষাপটে গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং তৎকালীন ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদির ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে গুলির ঘটনা দেশের রাজনীতিতে এক সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করেছে। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদের দ্বারা এই হামলার ঘটনা দেখিয়েছে, যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব যারা দেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত এবং রাজনীতি-নিরপেক্ষ নীতির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন, তারা এখন এক ধরনের হিটলিস্টে আছেন। এই ঘটনার পর থেকে সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ওই নেতা ও আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় এবং জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের গানম্যান প্রদান করা হয়েছে। ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্সের প্রক্রিয়াও চলছে। এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা এবং মুখ্য সমন্বয়ক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম। এই ব্যক্তিরা শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, বরং দেশের সংবেদনশীল সময়ে জনমত ও আন্দোলন সংগঠনের মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

এর পাশাপাশি বেশ কয়েকজন সংসদ-সদস্য প্রার্থী এবং রাজনৈতিক নেতাও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গানম্যান ও অস্ত্রের লাইসেন্স চেয়ে আবেদন করেছেন। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (জেপি) প্রধান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমানও তাদের আবেদন পেশ করেছেন। সরকারি সূত্র থেকে জানা গেছে, আবেদনের ভিত্তিতে কয়েকজনকে গানম্যানসহ অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। এতে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকি, ডেমরা-যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে বিএনপি মনোনীত সংসদ-সদস্য প্রার্থী তানভির আহমেদ রবিন, পাবনা-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী জাফির তুহিন, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদসহ অন্যান্য নেতাদের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সুবিধার অংশ হিসেবে শহীদ ওসমান হাদির পরিবারের সদস্যরাও বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আওতায় আছেন। হাদির এক বোনকে লাইসেন্সসহ গানম্যান দেওয়া হবে এবং অন্য সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক পুলিশি নজরদারি চালানো হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের উচ্চপর্যায়ের সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম সংবাদ সংক্রান্ত বিষয়ে বলেছেন, “জুলাই যোদ্ধা এবং সংসদ-সদস্য প্রার্থীদের মধ্যে যারা নিরাপত্তা চেয়েছেন, তাদের বিষয়ে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের প্রধান দায়িত্ব এবং আমরা চাই, কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের দায়িত্ব পালনে নিরাপদে থাকতে পারুক।”

এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করছে। এটি দেখাচ্ছে যে, রাজনৈতিক নেতা, আন্দোলনকারী এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব যারা দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন নীতি রক্ষায় কাজ করছেন, তাদের নিরাপত্তা সরকার বিশেষভাবে নিশ্চিত করছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত সুরক্ষা নয়, বরং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যারা জনসমক্ষে দেশের সার্বভৌমত্ব, সংবিধানিক অধিকার এবং জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য দৃঢ়ভাবে অবস্থান গ্রহণ করেন, তারা প্রায়শই ঝুঁকির মুখে পড়েন। তাই সরকারের উদ্যোগে গানম্যান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাজনীতির স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড এবং জনগণের অংশগ্রহণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এটি শুধুমাত্র নেতা বা প্রার্থীর নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সংরক্ষণ করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ধরনের উদ্যোগ দেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে। সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে রাজনৈতিক এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে তারা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ এবং আন্দোলন চালাতে সক্ষম হবেন। এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সংলাপ এবং সমাজে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

অতএব, নাহিদ হাসনাতসহ অন্যান্য রাজনীতিক ও আন্দোলনকারীদের গানম্যান এবং অস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়। এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত, যা দেখাচ্ছে যে, রাষ্ট্র স্বতন্ত্র ও নীতি-নিরপেক্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তা রক্ষায় সচেষ্ট। এটি রাজপথে, সংসদে এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা পাঠাচ্ছে—বাংলাদেশে আইনের উর্ধ্বে কোনো হুমকি বা রাজনৈতিক চাপ শিথিল নয়, এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। এটি শুধু রাজনৈতিক নেতা বা আন্দোলনকারী ব্যক্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করবে না, বরং জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগও বৃদ্ধি করবে। ফলে রাজনীতির স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের বিকাশও সহজ হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত