হাদি হত্যার বিচারে ২৪ ঘণ্টায় ট্রাইব্যুনাল দাবিতে উত্তাল রাজপথ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৪ বার
হাদি হত্যার বিচারে ২৪ ঘণ্টায় ট্রাইব্যুনাল দাবিতে উত্তাল রাজপথ

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘রাষ্ট্রীয় পরীক্ষা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিশেষ বিচারিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের জোরালো দাবি জানিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রের ওপর জনগণের আস্থা আরও গভীর সংকটে পড়বে এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ বাধাগ্রস্ত হবে।

সোমবার দুপুরে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের এ দাবি তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে জুলাই বিপ্লবের বিভিন্ন পর্যায়ের সহযোদ্ধা, ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মী ও সাধারণ সমর্থকেরা উপস্থিত ছিলেন। পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল শোক, ক্ষোভ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের আবহ।

আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড সেই প্রত্যাশাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, এই হত্যার পর দৃশ্যমান বিচারিক অগ্রগতি না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—রাষ্ট্র কি আদৌ সাহসী ও জনপ্রিয় কণ্ঠগুলোর নিরাপত্তা দিতে সক্ষম।

তিনি বলেন, ওসমান হাদি ছিলেন জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের এক সাহসী রাজনৈতিক মুখ, যিনি কোনো আপস ছাড়াই সত্য কথা বলতেন এবং ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে আঙুল তুলতে দ্বিধা করতেন না। ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে তিনি রাজনীতিতে একটি ভিন্ন ধারা তৈরি করেছিলেন, যা অনেকের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে তার হত্যাকাণ্ড নিছক একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

সংবাদ সম্মেলনে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে বলা হয়, যদি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তে ব্যর্থ হয়, তবে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা নেওয়ার বিকল্প নেই। আবদুল্লাহ আল জাবের এফবিআই বা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মতো সংস্থার উদাহরণ টেনে বলেন, অতীতেও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল মামলাগুলোতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে। কাজেই ওসমান হাদির মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের হত্যার ক্ষেত্রেও সেই পথ অনুসরণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে পরিকল্পিতভাবে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডকে মূল রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন ইস্যু সামনে এনে এই হত্যাকে ‘মেইন সাবজেক্ট’ থেকে বাদ দেওয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, হাদিকে কেন্দ্র করেই রাষ্ট্রের বর্তমান সংকটগুলো উন্মোচিত হয়েছে এবং এই হত্যার বিচার ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সরাসরি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ওসমান হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দেশে কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। তার দাবি, বিচার এড়িয়ে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করে সরকার দায় এড়াতে চাইলে জনগণ তা মেনে নেবে না। ইনকিলাব মঞ্চ প্রয়োজনে রাজপথে অবস্থান কর্মসূচি আরও জোরদার করবে এবং এই দাবিতে কোনো আপস করা হবে না।

তিনি বলেন, তদন্তে কারা বাধা দিচ্ছে, কারা নেপথ্যে প্রভাব খাটাচ্ছে এবং সরকার কেন এখনো দৃঢ় অবস্থান নিতে পারছে না—এসব প্রশ্নের উত্তর জাতির সামনে স্পষ্ট করতে হবে। খুনিরা যদি দেশের বাইরে পালিয়ে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক বন্দি বিনিময় বা পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উলফা নেতাদের হস্তান্তরের নজির টেনে তিনি বলেন, অতীতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে কঠিন কাজও সম্ভব হয়েছে। কিন্তু একতরফা সমঝোতার রাজনীতি ও দায়সারা বক্তব্য দিয়ে জনগণকে আর সন্তুষ্ট করা যাবে না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সন্তোষজনক ও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না এলে ইনকিলাব মঞ্চ রাজপথ ছাড়বে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হাদি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। একদিকে সামনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট, অন্যদিকে জুলাই বিপ্লবের সহযোদ্ধাদের মধ্যে বাড়তে থাকা নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভ—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা সরকারের জন্য সহজ হবে না।

সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচার দাবিতে নানা পোস্ট, আলোচনা ও প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, হাদি হত্যার বিচার দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন না হলে তা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।

সব মিলিয়ে, শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড এখন আর শুধু একটি মামলার বিষয় নয়; এটি জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার বড় মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করবে রাজপথের উত্তাপ ও দেশের রাজনৈতিক গতিপথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত